লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে চলমান সংঘাতের মধ্যে বাসিন্দারা এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন—বাড়িতে থাকলে প্রাণহানির ঝুঁকি, আর পালালে বাড়ছে দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা।
দক্ষিণাঞ্চলের শহর টাইর-এর বাসিন্দা এম সাঈদ জানান, ইসরায়েলের জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের পর আতঙ্কে মানুষ ঘর ছাড়তে শুরু করে। কেউ ঠিকমতো পোশাক পরার সুযোগ পাননি, বৃদ্ধরা হেঁটে পালাচ্ছিলেন—পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
তিনি স্বামী ইয়াসের, মেয়ে সামিহা ও নাতনিকে নিয়ে দ্রুত গাড়িতে করে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হন। স্বাভাবিকভাবে কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে তাদের লেগে যায় প্রায় তিন ঘণ্টা। পরে তারা রাজধানী বেইরুত-এ আশ্রয় নেন।
মার্চের শুরুতে ইসরায়েল লেবাননে হামলা জোরদার করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কয়েক দিনের মধ্যে দেশটির প্রায় ১৪ শতাংশ এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এতে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশেরও বেশি।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ বলে উল্লেখ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন, আবার কেউ কেউ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আল-আব্বাসিয়াহ এলাকার বাসিন্দা আয়া বলেন, আগের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, আশ্রয়ের জন্য বাড়িভাড়া অত্যধিক বেড়ে যায় এবং অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তাই তিনি পরিবারসহ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তার ভাষায়, “বাস্তুহীন হওয়ার কষ্টের চেয়ে কখনও কখনও বোমাবর্ষণের মধ্যে থাকা মানসিকভাবে সহজ মনে হয়।”
দক্ষিণ লেবাননের মানুষের সঙ্গে তাদের জমি ও বসতভিটার গভীর আবেগী সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে বহুবার সংঘাত ও দখলের অভিজ্ঞতা তাদের এই বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে।
তবে বাস্তুচ্যুতদের জন্য জীবন সহজ নয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুত মানুষদের মধ্যে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার বেশি থাকে। নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক চাপ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে তারা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন যুদ্ধবিরতি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল।
এর মধ্যেই একদিনে ভয়াবহ হামলায় শতাধিক স্থানে আঘাত হানে ইসরায়েল, যেখানে শত শত মানুষ নিহত ও আহত হন। এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অবশেষে দীর্ঘ সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হামলা চলতে থাকে। স্থানীয়দের মতে, যুদ্ধবিরতির ঠিক আগ মুহূর্তেও বহু এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের বহু এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাসিন্দারা নিজেদের বাড়ির চারপাশে ভেঙে পড়া ভবন দেখছেন, হারিয়েছেন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
এই সংকট কেবল নিরাপত্তার নয়, এটি মানবিক ও অর্থনৈতিক দুর্যোগেও রূপ নিয়েছে—যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই ঝুঁকিপূর্ণ, আর কোনো পথই সহজ নয়।
















