মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত আগুনে জ্বলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর ভাষায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন—মাদক পাচার বাড়ানো থেকে শুরু করে মার্কিন সীমান্তে অভিবাসী ঢল তৈরির দায়ও চাপিয়েছেন তাঁর ওপর।
এরই মাঝে ক্যারিবিয়ান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শন উত্তেজনাকে আরও তীব্র করেছে। ওয়াশিংটন বলছে এটি মাদকবিরোধী অভিযান, আর কারাকাস মনে করছে—এটি মাদুরো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা।
এ অবস্থায় মার্কিন নিরাপত্তা টিমের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প ‘পরবর্তী পদক্ষেপ’ নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানায়। ফলে যুদ্ধের আশঙ্কা যেন ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে।
গত সপ্তাহে মিরাফ্লোরেস প্রাসাদের সামনে সমবেত জনতার উদ্দেশে মাদুরো বলেন, তিনি শান্তি চান, তবে সেই শান্তি হতে হবে “সার্বভৌম, স্বাধীন ও মর্যাদার”—“আমরা দাসের শান্তি চাই না, উপনিবেশের শান্তিও চাই না। উপনিবেশ কখনও নয়, দাসত্ব কখনও নয়!”
ট্রাম্প সম্প্রতি সিআইএকে গোপন অভিযান পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী জেরাল্ড আর ফোর্ড, হাজার হাজার সেনা ও এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান মোতায়েন করেছেন ক্যারিবিয়ানে। নভেম্বরের শেষ দিকে তিনি জানান—ভেনেজুয়েলায় স্থল হামলাও ‘যেকোনো সময়’ হতে পারে। যদিও পরে সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর এ সমস্ত পদক্ষেপ নিয়ে “অতিরিক্ত কিছু ভাবার দরকার নেই”।
ভেনেজুয়েলাও হাত গুটিয়ে বসে নেই। সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে টানা সামরিক মহড়া চালাচ্ছে দেশটি।
দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন-মাদুরোর সম্পর্ক উত্তেজনায় ভরা। হুগো চাভেজের আমল থেকেই দ্বন্দ্বের বীজ বপন হয়ে যায়, যা ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর আরও গাঢ় হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন হামলায় নিহত হয়েছে বহু মানুষ, যা অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযোগ করেছেন, মাদুরো নাকি ‘কার্টেল দে লস সোলে’স নামের একটি মাদক চক্রের নেতৃত্ব দেন। তবে এই দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই সংগঠন মূলত কোনো পূর্ণাঙ্গ কার্টেলই নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে অঞ্চলে ১৫ হাজার সেনা পাঠিয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১টি নৌ-আক্রমণে অংশ নিয়েছে মার্কিন বাহিনী, যেখানে নিহত হয়েছে ৮৩ জন পর্যন্ত। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এতো বিশাল শক্তি কেবল মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য নয়—এটি রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুকেই ইঙ্গিত করে।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আদালত আদেশ দিয়েছে ভেনেজুয়েলার তেল কোম্পানি সিটগো বিক্রির—ঋণ শোধে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে। কারাকাস এই ‘জোরপূর্বক বিক্রি’কে দেশের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত বলে মন্তব্য করেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও মার্কিন হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী মিত্র হিসেবে রয়েছে রাশিয়া, চীন ও ইরান। লাতিন আমেরিকায় কিউবা, নিকারাগুয়া ও বলিভিয়াও কারাকাসের ঘনিষ্ঠ। তবে প্রতিবেশী ব্রাজিল ও কলম্বিয়া মাদুরোর ২০২৪ সালের পুনর্নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি, যদিও সামরিক হুমকির বিষয়টিতে তারা উদ্বেগ জানিয়েছে।
বিশাল তেলের ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, দুর্বল অবকাঠামো, অব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের অভাবে দেশটির উৎপাদন ক্রমশ কমেছে। ২০২৪ সালে ভেনেজুয়েলার জিডিপি ছিল মাত্র ১১৯.৮ বিলিয়ন ডলার—লাতিন আমেরিকার অন্যতম ক্ষুদ্র অর্থনীতি।
নভেম্বরের শেষে মাদুরো ওপেক সদস্যদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অবৈধ হুমকি’ মোকাবিলায় সহায়তা চান। তবে এখনো কেউ প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। নভেম্বরের মাঝামাঝি এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ভেনেজুয়েলায় স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা “অস্বীকার করছেন না”। পরে রয়টার্স জানায়—ট্রাম্প নাকি ফোনে মাদুরোকে দেশ ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, এক সপ্তাহ সময় দিয়ে। যদিও আল জাজিরা এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
যুদ্ধের অন্ধকার যেন আরও ঘনিয়ে আসে—আর লাতিন আকাশের ওপর ঝুলে থাকে অনিশ্চয়তার ভারী মেঘ।
















