শীতকালে তাপমাত্রা নেমে এলে অনেকেই তৎক্ষণাৎ হিটার জ্বালিয়ে বা গরম জামাকাপড় দিয়ে শরীরকে ঢেকে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে—ঠাণ্ডা থেকে সামান্য ঝুঁকি নিলে আমাদের শরীরের একটি বিশেষ চর্বি, ব্রাউন ফ্যাট, সক্রিয় হয়ে ক্যালোরি জ্বালিয়ে তাপ উৎপাদন করতে পারে এবং সম্ভবত মেটাবলিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে।
ব্রাউন ফ্যাট কি এবং কেন আলাদা
শুধু বাচ্চাদের মধ্যে থাকে—এমন ধারনা আগে ছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের পর গবেষণা দেখিয়েছে যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেও ব্রাউন ফ্যাট থাকে এবং সাধারণত তাপমাত্রা নিচে নেমলে সেটি সক্রিয় হয়ে রক্ত থেকে গ্লুকোজ ও চর্বি শুষে নিয়ে সরাসরি ত্রাণে রূপান্তর করে। অন্য চর্বির তুলনায় ব্রাউন ফ্যাটের কোষে মাইটোকন্ড্রিয়ার ঘনত্ব অনেক বেশি এবং সেখানে থাকা একটি বিশেষ প্রোটিন ইউসিপি১ ক্যালোরিকে ATP বানিয়ে রাখার বদলে তাপ উৎপাদনে ব্যবহার করে।
স্বাস্থ্যগত প্রমাণ ও সীমাবদ্ধতা
রকফেলারের পল কোহেনら ২০২১ সালে প্রায় ৫২ হাজার পিইটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করে দেখান, যাদের শরীরে ব্রাউন ফ্যাট ছিল তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্ট্রোকসহ মেটাবলিক রোগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। ব্রাউন ফ্যাটও বেশি থাকলে রক্তে গ্লুকোজ ও ট্রাইগ্লিসারাইড কম এবং ইনসুলিন সেনসিটিভিটি ভালো পাওয়া গেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন—ব্রাউন ফ্যাটই ওজন কমানোর একক সমাধান নয়। বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের দেহে ব্রাউন ফ্যাটের পরিমাণ খুবই সীমিত (শরীর ওজনের মাত্র অর্ধ শতাংশও নাও হতে পারে), তাই এটি একা কেটে শতকিলোগ্রাম সাদা চর্বি পুড়িয়ে ফেলার মতো সামর্থ্য রাখে না। বরং ব্রাউন ফ্যাটকে সক্রিয় করলে রক্তে শর্করা কমাতে এবং মেটাবলিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে সহায়তা থাকতে পারে — বিশেষত মোটা রোগীদের জটিলতা ঝুঁকি মোকাবিলায়।
কীভাবে ব্রাউন ফ্যাট সক্রিয় করবেন
গবেষণার আলোকে কিছু পদ্ধতি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে, তবে প্রত্যেকের জন্য সেসব নিরাপদ বা উপযুক্ত নাও হতে পারে—
• ঠাণ্ডা ভাবানুভূতি: ঠাণ্ডা জল স্নান, বরফের টব বা ক্রায়োথেরাপি শরীরকে স্ট্রেস করায় নরঅ্যাড্রেনালিন মুক্তি পায়, যা ব্রাউন ফ্যাটকে সক্রিয় করে। নর্দান লেক-সাঁতার গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে সপ্তাহে ২–৩ বার কয়েক মিনিটের আইস প্লাঞ্জ ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে পারে।
• কুল তাপমাত্রা: সম্পূর্ণ জলের তাণ্ডব না করেই রুম তাপমাত্রা হালকা নামিয়ে (কিছু গবেষণায় রাতের তাপমাত্রা ১৯°C-এ এক মাসে ব্রাউন ফ্যাট ভলিউম ৪২% বাড়ে বলে দেখা গেছে) শরীরে একই ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে। আরেক অভিজ্ঞতামূলক ট্রায়ালে প্রতিদিন ১৫–১৬°C তাপমাত্রায় ছয় ঘণ্টা রেখে মাত্র ১০ দিনে ব্রাউন ফ্যাট সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
• ঠাণ্ডা ভেস্ট বা কোল্ড ভেস্ট: গবেষকরা এখন পরীক্ষা করছেন শীতল পানীয় পুনরাবৃত্তি করে পরিধেয় ভেস্ট দিয়েও কি একই উপকার পাওয়া যায় কিনা—ভেস্টে ঠাণ্ডা জল সঞ্চালন করে শরীরকে শীতল স্তরে রাখা হয় যাতে কেঁচকলির আগে শিখা উঠেছে।
• খাবার এবং পানীয়: কফি-এ থাকা ক্যাফেইন এবং লঙ্কা-জাতীয় ক্যাপসাইসিন মাইস-স্টাডি ও সীমিত মানুষের পরীক্ষায় ব্রাউন ফ্যাট সক্রিয় করতে সহায়তা করতে পারে; তবে বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে অনেকে অসম্ভব পরিমাণে কফি পান করতে হবে—এটি অনুশীলনযোগ্য নয়। ক্যাপসাইসিন পিল নিয়ে ছোট এক পরীক্ষায় ঠাণ্ডার সঙ্গে একত্রে সেবনে ব্রাউন ফ্যাটের প্রতিক্রিয়া বেশি দেখেছে অংশগ্রহণকারীরা।
সতর্কতা ও বাস্তব পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠাণ্ডায় নিজে-ই ঝাঁপ দিয়ে শরীর জাহাজে ফেলা বা ক্রায়োথেরাপির মতো পদ্ধতি সবাইর উপযুক্ত নয় — হার্টের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলে বিপদ বাড়ে। তাই ঠাণ্ডা সিচুয়েশন চেষ্টা করার আগে সবসময় চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন। এছাড়া ব্রাউন ফ্যাট সক্রিয় করাই সবচেয়ে কার্যকর কোনো জাদু নয়—হৃদ্য স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, নিয়ন্ত্রিত ওজন, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণই বহুলাংশে গুরুত্বপূর্ণ।
অবশেষে বিজ্ঞানীরা মনে করেন ব্রাউন ফ্যাটকে চিকিৎসায় কাজে লাগানো হলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা বয়স্কদের মেটাবলিক জটিলতা কমাতে তা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু ওজন কমানোর একক পদ্ধতি হিসেবে এখনো তা প্রমাণিত নয়। তাই সুষম খাদ্য, কার্যকর শারীরিক ক্রিয়াকলাপ ও চিকিৎসকের নির্দেশই প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত।
















