শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড় দিতওয়ার অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক মৃত্যুযাত্রা। প্রবল বর্ষণ, বন্যা আর ভূমিধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৬ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাহাড়ি চা-বাগানের অঞ্চল বদুল্লা ও নুয়ারা এলিয়ায় ভূমিধস যেন একের পর এক গ্রামকে গিলে ফেলেছে, আর এরই মাঝে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কান্না, শোক আর নিঃস্বতার দীর্ঘশ্বাস।
শুক্রবার ভোরে ঘূর্ণিঝড় দিতওয়া স্থলভাগে আঘাত হানে পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে। ঘণ্টায় প্রায় ৬৫ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা দমকা হাওয়া আর টানা ৩০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টি পাহাড়ের বুক থেকে মাটি আলগা করে নামিয়ে আনে জীবনের উপর মৃত্যুর পর্দা। সেই কাদার নিচে চাপা পড়ে বহু মানুষের স্বপ্ন, ঘরবাড়ি আর আগামীর আশ্বাস।
সরকার জানিয়েছে, শুধু বদুল্লা ও নুয়ারা এলিয়া অঞ্চলে অন্তত ২৫ জন ভূমিধসে মারা গেছেন। দেশজুড়ে নিখোঁজ মানুষদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে। বহু পরিবার খুঁজে ফিরছে তাদের প্রিয়জনকে, যারা হয়তো বৃষ্টির সেই অন্ধকার রাতে জীবন-মৃত্যুর সীমানায় হারিয়ে গেছেন।
বন্যা ও ধ্বংসস্তূপে ভেসে গেছে চারটি বাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছয়শোরও বেশি। রাস্তায় ভাঙা গাছ, কাদা, মাটি—যেন চলাচলের প্রতিটি পথকে আটকে দিচ্ছে। রেললাইন submerged হয়ে পড়েছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বহু এলাকা।
আকাশপথও রেহাই পায়নি। মস্কাট, দুবাই, নয়াদিল্লি ও ব্যাংককসহ বিভিন্ন শহর থেকে আগত অন্তত ১৫টি ফ্লাইটকে কলম্বোর বান্দারানায়েকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে মাত্তালা, ত্রিবান্দ্রম এবং কোচির বিমানবন্দরে।
এদিকে বিপর্যস্ত মানুষদের বাঁচাতে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশ। হানওয়েল্লায় একটি বাড়ির ছাদে আটকা পড়া তিনজনকে উদ্ধার করেছে সামরিক হেলিকপ্টার। নৌকায় মানুষ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্লাবিত অঞ্চলগুলো থেকে। জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে ৪৩ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র।
বিপদের চিহ্ন লাল রেখায় রাঙিয়ে দিয়েছে সেচ অধিদপ্তর। কেলানি নদীর তীরবর্তী এলাকায় জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা, যেখানে বন্যার ঝুঁকি আগামী ৪৮ ঘণ্টা আরও বাড়তে পারে। রাজধানী কলম্বোও রয়েছে এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিসরের ভেতরে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের মধ্যে স্থবির হয়ে পড়েছে শ্রীলঙ্কার সরকারি কার্যক্রম। শুক্রবার বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল, সরকারি অফিস, স্থগিত রয়েছে ট্রেন চলাচল। আগে ভাগেই লেনদেন বন্ধ করেছে কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জ।
অর্থনৈতিকভাবে জর্জরিত শ্রীলঙ্কার জন্য এই দুর্যোগ এক নতুন পরীক্ষা। গত বছর নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আনুরা কুমারা দিশানায়েকে প্রতিশ্রুত দিয়েছিলেন কঠোর মিতব্যয়িতা থেকে মুক্তির। অথচ দেশকে দাঁড় করানোর লড়াইয়ের মাঝেই এভাবে প্রকৃতির কোপ নেমে এসেছে। পর্যটন খাতে কিছুটা আলো দেখা গেলেও তা এখনও নড়বড়ে, অনেকটাই ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল।
দেশের মানুষের বুক ভেঙে যায় যখন নদীর পানির স্রোতে ভেসে যায় শিশুদের খেলা, পাহাড়ের কাদায় চাপা পড়ে যায় শত বছরের ঘরবাড়ি, আর নিখোঁজদের তালিকায় প্রতিদিন যোগ হয় নতুন নাম। শ্রীলঙ্কা আজ এক রুক্ষ দ্বীপ—যেখানে প্রকৃতির নির্মম আঘাতে মানুষের বেঁচে থাকা যেন হয়ে উঠেছে শেষ পর্যন্ত এক অবিচল লড়াই।
আপনি চাইলে আমি এই প্রতিবেদনটির সংক্ষিপ্ত ভার্সনও তৈরি করে দিতে পারি।
















