সুদানের জ্বলন্ত গৃহযুদ্ধে নতুন করে যুক্ত হলো আরেকটি নির্মম অধ্যায়। পশ্চিম কর্দোফানের আল-নুহুদ হাসপাতালের বিশাল অংশকে সামরিক ঘাঁটি ও ব্যারাকে রূপান্তর করেছে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)। পাঁচ মাস আগে শহরটি দখল করার পর থেকেই হাসপাতালের দোরগোড়ায় ঢুকে গেছে যুদ্ধের লৌহমুষ্টি। চিকিৎসার আশ্রয়স্থল আজ বন্দুকের ছায়ায় পরিণত হয়েছে।
সুদান ডাক্তারস নেটওয়ার্ক শুক্রবার জানিয়েছে, সরকারি বাহিনী SAF-এর প্রতিদ্বন্দ্বী RSF হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ করে এভাবে মানুষের জীবন বাঁচানোর পথটিকেই রুদ্ধ করে দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষদের জন্য যে হাসপাতাল ছিল শেষ আশ্রয়, আজ সেখানে চিকিৎসকরা অভিযুক্ত হচ্ছেন সামরিক সহযোগিতার নামে, আর অনেকে শহর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।
এতে হাসপাতাল ভুগছে মারাত্মক কর্মীসংকটে। বাকি থাকা সেবাগুলো এখন এতটাই সীমিত যে মানুষের দীর্ঘশ্বাস পর্যন্ত শোনার সুযোগ নেই। রোগীদের চাহিদা মেটানোর মতো শক্তি আর সক্ষমতা আর নেই এই একসময়ের প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠানের।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে SAF এবং RSF-এর মধ্যে অগ্নিকুণ্ডে রূপ নেওয়া যুদ্ধ আজও থামেনি। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতার প্রতিটি প্রচেষ্টাই যেন হারিয়ে গেছে ধ্বংসস্তূপের নিচে। হাজারো মানুষের মৃত্যু, কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি—বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক বিপর্যয়ের মঞ্চ হয়ে উঠেছে সুদান।
এদিকে, দারফুরে এল-ফাশের শহর দখলের পর নতুন আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে RSF-এর উপস্থিতি। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল জানিয়েছে, গত এক মাসে অন্তত ৪০০ শিশু বাবা-মা ছাড়াই তাউইলা শহরে পৌঁছেছে। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। ১৮ মাসের অবরোধে খাদ্য, ওষুধ, আশ্রয়—সবকিছু থেকে বঞ্চিত এলাকা এখন মৃত্যু আর ভয়ের নগরীতে পরিণত।
RSF-এর বিরুদ্ধে গণহত্যা, অপহরণ, যৌন সহিংসতা—অগণিত অভিযোগ বাতাসে ঘুরছে। অন্যদিকে SAF-ও অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধের নানা ক্ষতচিহ্ন নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব দিয়েছে দুই পক্ষকে। RSF ইতোমধ্যে একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। কিন্তু পরদিনই SAF জানায়, তারা পশ্চিম কর্দোফানের বাবনুসায় RSF-এর হামলা প্রতিহত করেছে—যেন যুদ্ধের আগুন আরও একবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।
সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি লিখে অনুরোধ জানিয়েছেন, যুদ্ধ থামানোর পথে ওয়াশিংটন যেন নেতৃত্ব দেয়। কিন্তু বহু আগেই ভেঙে গেছে বুরহান ও তার সাবেক ডেপুটি, RSF প্রধান হেমেদতির মধ্যে বিশ্বাসের সেতু। প্রতিটি আলোচনাই যেন শেষ হয়েছে অচলাবস্থায়, রেখে গেছে শুধু লাশ, ক্ষুধা আর চোখভরা ভয়।
ট্রাম্প সম্প্রতি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি এই যুদ্ধ শেষ করবেন—সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুরোধে। কিন্তু মানুষ জানে, প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় হয় জীবনের ক্ষতচিহ্ন; সুদানের আকাশে যুদ্ধের ধোঁয়া এখনো কাটেনি।
চিকিৎসার ঘরে বন্দুক, হাসপাতালের আঙিনায় যুদ্ধের বুট—সুদান আজ তার সবচেয়ে অন্ধকারতম সময় পার করছে। যুদ্ধের মাঝে চিকিৎসাহীন অসহায় মানুষের আর্তনাদ যেন আকাশ ভেদ করে ছুটে যাচ্ছে, তবুও শান্তির আলো এখনো দূরের একটি ক্ষীণ বিন্দু।
















