রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ভাঙচুর ও যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ‘হার্ডলাইন’ অবস্থান গ্রহণ করেছে সরকারি দল বিএনপি। দলের নেতাকর্মী বা দায়িত্বশীল কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ওঠামাত্রই তা দ্রুত যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এই জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে সর্বশেষ রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশে গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পদত্যাগ করেন ওই সংসদ সদস্য। এর আগেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয় এবং একাধিক সহযোগী সংগঠনের কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা হাসিল বা কোনো ধরনের অনিয়ম-অপকর্মে জড়ালে কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে একই সঙ্গে কোনো অভিযোগ এলে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে ঘটনার সঠিক সত্যতা নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর দলীয় ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দলের অবস্থান তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানান, যেকোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে দল জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে এবং প্রধানমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। দীর্ঘ ১৫ বছর বিএনপির নেতাকর্মীরা মারাত্মক নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হওয়ায় রাজনৈতিক পালাবদলের পর কারও কারও মধ্যে ‘আওয়ামী লীগ অন্যায় করেছে, আমিও করব’—এমন এক ধরনের ক্ষতিকর মানসিকতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, যেকোনো মূল্যে দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে। সেলিমা রহমান সামাজিক মাধ্যমে সত্যতা যাচাই না করেই বিএনপিকে ঢালাওভাবে দায়ী করে অপপ্রচারের সমালোচনা করেন এবং মনে করিয়ে দেন যে সরকার গঠনের আগে থেকেই দল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে আসছে।
অন্যান্য দলীয় নেতারা বলছেন, সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, বরং পুরো সাংগঠনিক কাঠামোর কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যে পদ বা পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে বা দায়িত্বহীনভাবে কাজ করার অধিকার দেয় না। যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না জানান, দলের মেয়াদোত্তীর্ণ ও সমস্যাগ্রস্ত কমিটিগুলো বিলুপ্ত করা হচ্ছে এবং কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না। একজন সংসদ সদস্যকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বড় ও ইতিবাচক নজির স্থাপন করেছে বলে মন্তব্য করে তিনি গণমাধ্যমকেও সরকারের এই শক্ত অবস্থান তুলে ধরার আহ্বান জানান।
এদিকে হাইকমান্ডের এমন কঠোর সিদ্ধান্তে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা পর্যায়ের নেতারা জানান, কেন্দ্র থেকে দলীয় শৃঙ্খলার স্পষ্ট নির্দেশনা আসায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বুঝতে পেরেছেন যে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, কিংবা স্থানীয় বিরোধে জড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটালে দলীয় পরিচয় কোনো রক্ষা করবে না।
পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, কেন্দ্র থেকে দেওয়া বার্তাটি তৃণমূলের জন্য একটি বড় শিক্ষা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দখলবাজি, ভোট চুরি, ব্যাংক লুটপাট ও অর্থ পাচারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যে অর্থ নিজে ভোগ করা যায় না এবং যে অপকর্মের কারণে দেশে থাকা যায় না বা ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
মাগুরা জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আলী আহমদ বলেন, শীর্ষ নেতৃত্ব ঘটনার সত্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। পদ বা পরিচয়ের কারণে অপরাধীকে ছাড় না দেওয়ার এই নীতি বজায় থাকা উচিত। কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন, দীর্ঘ দিন পর রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া বা নতুন নেতৃত্বে আসা অনেকের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় কেন্দ্রীয় নির্দেশনার সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আকরামুল হাসান বলেন, একজন এমপির বিরুদ্ধে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, পার পাওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে ছাত্রদলের সহসভাপতি রিয়াদ রহমান এটিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃঢ় নেতৃত্ব ও আদর্শের কারণেই বিএনপি অপরাধের বিরুদ্ধে এমন শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারছে। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার বন্ধ করে বিরোধীদের দায়িত্বশীল রাজনীতিতে ফিরে আসার আহ্বান জানান।


























