রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি—বিশ্বের অনেক দেশই একের পর এক বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদন ফেরত দিচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা বা পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই ভিসা পাওয়া যেন দুষ্কর হয়ে উঠেছে।
হাঙ্গেরি ও যুক্তরাষ্ট্রে স্কলারশিপ পাওয়া শিক্ষার্থী তানজুমান আলম ঝুমা জানিয়েছেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে দুই দেশে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ার পরও ভিসা না পেয়ে তিনি যেতে পারেননি। বুদাপেস্টে আবেদন করে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও কোনো ফল না পাওয়ায় পরে যুক্তরাষ্ট্রে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। তার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী একই হতাশার মুখে পড়ছেন।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে সহজে ভিসা দিত ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও এখন নানা কারণে ভিসা দিতে অনীহা দেখাচ্ছে। অথচ ভারতের পর্যটন ভিসা ছাড়া বাংলাদেশিদের ওপর আনুষ্ঠানিক কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। বিশ্লেষকদের মতে, অনিয়মিত পথে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা ও ভিসার অপব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশিদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান দাবি করেন, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, উজবেকিস্তান, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম—এসব দেশ এখন বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়াতেও ভিসা প্রক্রিয়ায় অযথা দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি অন অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়া শ্রীলঙ্কার ই-ভিসাতেও এখন দুই থেকে তিন দিন সময় লাগছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ভারতের পর্যটন ভিসা বন্ধ হয়। যদিও এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে, ভিসা না দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার আরও অনেক দেশে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ ভিসা দিলেও এই বছর ভিসা সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান জটিলতার মূল কারণ অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও বিদেশে গিয়ে অনিয়মিত পথে প্রবেশের প্রবণতা। পূর্বে সহজলভ্য দেশের ভিসা নিয়ে অন্য দেশে অনুপ্রবেশের ঘটনাও নজরে এসেছে বহুবার। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেছেন, ভিসার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেকেই অনিয়মিতভাবে বিদেশে ঢুকে পড়ছে, যার ফলে অনেক দেশই এখন সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
পাসপোর্ট র্যাংকিংও একটি প্রভাবক—হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তালিকায় বাংলাদেশ সপ্তম দুর্বলতম পাসপোর্টধারী দেশ। বাংলাদেশি নাগরিকরা মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসামুক্ত ভ্রমণ করতে পারেন, যেগুলোর বেশিরভাগই আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের।
সংকট মোকাবিলায় বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথমত দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিদেশে অনিয়মিত পথে যাওয়া রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ভ্রমণ ভিসা ব্যবহার করে শ্রমিক পাঠানোর অনিয়ম বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়ানো ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন করাও জরুরি।
















