ক্যারিবীয় সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মতোই অস্থির হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক। কয়েক সপ্তাহ ধরে সমুদ্রের বুক চিরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এগিয়ে এসেছে ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে, আর সেই দৃশ্য যেন অশান্তির এক ছায়া ফেলে দিয়েছে কারাকাসের আকাশে। উদ্বেগ আর শঙ্কায় ভারী হয়ে ওঠা বাতাসের মাঝেই ভেনেজুয়েলা ঘোষণা করেছে এক বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতির অভিযান।
মঙ্গলবার দেশটি জানিয়েছে, সারাদেশে চলছে তাদের মতে একটি বিশাল সামরিক মোতায়েন, যার জবাবে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রও উন্মোচন করেছে সাদার্ন স্পিয়ার নামের নতুন সামরিক অভিযান। ওয়াশিংটনের দাবি, পশ্চিম গোলার্ধে নরকো সন্ত্রাসীদের দমনই এই অভিযানের লক্ষ্য। কিন্তু কারাকাসে অনেকে বিশ্বাস করছেন, এই সব কেবল এক অজুহাত—নির্মম ক্ষমতাচ্যুতি ঘটানোর অশরীরী হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
কারাকাসে দাঁড়িয়ে ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান হিল কাঁপা কণ্ঠে নয়, বরং বিদ্রোহী আত্মবিশ্বাসে বললেন, আমেরিকান সাম্রাজ্যকে আমাদের সতর্কবার্তা—অগ্রসর হবেন না। আমরা প্রস্তুত।
কিন্তু কি সত্যিই প্রস্তুত ভেনেজুয়েলা?
গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী বারবার আঘাত হেনেছে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন নৌযানে। দাবি, সেগুলো নাকি মাদক বহন করছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রমাণ দেখায়নি, দেখায়নি আইনি ভিত্তিও। চোখের সামনে ৮০ জন মানুষ প্রাণ হারালেও, অভিযোগের মানে খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনো।
এই উত্তেজনার পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র পাঠিয়েছে বিশাল যুদ্ধজাহাজের বহর, যার কেন্দ্রে আছে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক বিমানবাহী রণতরী—জেরাল্ড আর ফোর্ড। সমুদ্রের বুকে ভাসমান এক আকাশঘাঁটি, যার প্রতিটি ইঞ্চি যেন ক্ষমতার এক নীরব গর্জন। বিশাল এ বহর কারাকাসের সীমানায় পৌঁছে যেন বলে দিচ্ছে, উদ্দেশ্য শুধু মাদকবিরোধী অভিযান নয়, বরং আরও গভীরে কিছু অন্য হিসাব রয়েছে।
বিশ্লেষক মার্ক কান্সিয়ান লিখেছেন, এই রণতরী মাদক প্রতিরোধের জন্য নয়, শত্রুর বিরুদ্ধে আঘাত হানার জন্যই বেশি উপযোগী। আর সে আঘাতের ছায়া এখন গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে।
অশান্তির কুয়াশায় আচ্ছন্ন ভেনেজুয়েলা মঙ্গলবার জানালো একটি প্রতিরক্ষা মহড়ার কথা। প্রায় দুই লাখ সৈন্য, প্যারামিলিটারি যোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে শুরু হলো এক ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিমির পদ্রিনো লোপেজ বললেন, স্বাধীনতা রক্ষার পরিকল্পনা আরও উঁচু স্তরে নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি কোণায় তৈরি হচ্ছে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিরোধের দুর্গ।
তিনি দাবি করলেন, জাতি ঐক্যবদ্ধ, সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধ, আর ৯০ শতাংশ মানুষ কোনো বিদেশি আগ্রাসন মেনে নেবে না। শ্বাসরুদ্ধ মানবসমুদ্র তখনো শুনছিল তার কথা—ভেনেজুয়েলার আত্মমর্যাদা রক্ষার শপথ যেন ডুবে যাচ্ছিল ল্যাটিন আমেরিকার আকাশে।
সামরিক শক্তির দিক থেকে ভেনেজুয়েলা খুব শক্তিশালী নয়। ১৬০ দেশের তালিকায় দেশটির অবস্থান ৫০তম। লাতিন আমেরিকায় সপ্তম। তাদের বিমান বাহিনীর অনেক বিমানই অচল বা অস্বাভাবিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে। রাশিয়ান নির্মিত সু ত্রিশগুলো কিছুটা ভরসা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের এফ পঁয়ত্রিশের সামনে সেগুলোও খুব টিকতে পারবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তবুও ভয়হীন আত্মসমর্পণের ইতিহাস নেই এই দেশের। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি আগ্রাসন ঘটে, ভেনেজুয়েলা জানে তারা প্রচলিত যুদ্ধে জিততে পারবে না, কিন্তু দেশটিকে অশাসনযোগ্য করে তুলতে পারে। তারা যুদ্ধকে অসম লড়াইয়ে রূপ দিতে পারে, আর তাতেই বাড়বে আগ্রাসনের খরচ।
তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই যুদ্ধ চাইছে?
ট্রাম্প বলেছেন, তার লক্ষ্য শুধু মাদক প্রবাহ ঠেকানো। কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করেন, এটি নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার নতুন কৌশল। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী কার্লোস পিনা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আসল হিসাব এখনো রাজনৈতিক—যুদ্ধ নয়, চাপ বাড়ানোই মূল পথ। মাদুরোও জানেন, তাই তিনি ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছেন প্রতিরোধের ব্যয়, যাতে যেকোনো সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ হয়ে ওঠে অগ্রহণযোগ্য।
কিন্তু এবার আমেরিকারও এক ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। এত যুদ্ধজাহাজ, এত বিমান পাঠিয়ে এখন পিছু হটার সুযোগ খুবই কম। পিনা বলেন, ট্রাম্প কিছু না করলে সেটা হবে রাজনৈতিক পরাজয়। তাই তিনি ধীরে ধীরে আরও চাপ বাড়াবেন, আরও বাহিনী পাঠাবেন, আরও উস্কানি দেবেন।
ক্যারিবীয় সাগর তাই এখন আর শুধু নীল জলের শান্ত প্রতিচ্ছবি নয়। এটি হয়ে উঠেছে দুই শক্তির নীরব সংঘর্ষের ক্ষেত্র—একপক্ষের দাবদাহ, অন্যপক্ষের প্রতিরোধ। বাতাসে উড়ছে যুদ্ধের সম্ভাবনা, কিন্তু কোথাও যেন লেগে আছে কবিতার মতো এক দীর্ঘশ্বাস।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের আগুন কি জ্বলবে, নাকি কেবল আগুনের গন্ধে থেমে যাবে উত্তেজনার ঢেউ—তা এখনো কেউ জানে না। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার আকাশে ঝুলে আছে সেই প্রশ্ন, এক অনিশ্চিত ভোরের প্রতীক্ষায়।
















