ইতালির প্রোসিকিউটর দপ্তর এক মানবিক বিভীষিকা খুঁড়ে দেখছে, যা বহু বছর ধরে অন্ধকারে চাপা পড়ে ছিল। অভিযোগ উঠেছে, নব্বইয়ের দশকের রক্তঝরা বসনিয়া যুদ্ধে ইতালি থেকে ধনী মানুষরা সপ্তাহান্তে বিমানে চেপে যেতেন সারায়েভোর পাহাড়ে। সেখানে তারা টাকার বিনিময়ে নিশানা বানাতেন শহরের নিরীহ মানুষদের। এক আতঙ্কের নগর তখন চার বছরের অবরোধে কাতরানো, আর সেই অমানবিক খেলায় ছিন্নভিন্ন হত শিশু, যুবক, নারী, বৃদ্ধ—যে কেউ।
এই তদন্তের সূত্রপাত করেন ইতালীয় সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক এজিও গাভাজ্জেনি। আইনজীবীদের সঙ্গে মিলে তিনি একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে কিছু সচ্ছল ইতালীয় নাগরিক সারায়েভোর চারপাশের পাহাড়ে গিয়ে মানুষ হত্যাকে শিকার ভ্রমণ বানাতেন। তার কথায়, সমাজের সম্মানজনক মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এমন নরকীয় আনন্দ, যা কখনও আলোয় আসেনি।
ইতালির গণমাধ্যম জানায়, গাভাজ্জেনির অভিযোগে পাঁচজন সন্দেহভাজনকে ইতোমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা ছিলেন উদ্যোক্তা, অস্ত্রপ্রেমী, অর্থসম্পদে পরিপূর্ণ মানুষ—যারা সপ্তাহ শেষে ট্রিয়েস্টে জড়ো হতো, তারপর সার্বিয়ান এভিওজেনেক্স বিমানে চড়ে পৌঁছাত সারায়েভোর পাহাড়ে। সেখানে বসনিয়ান সার্ব মিলিশিয়াদের হাতে টাকা তুলে দিয়ে বন্দুক হাতে দাঁড়াত তারা। কথিত আছে, কে কাকে গুলি করবে, সেটারও দাম ঠিক ছিল। শিশুদের জন্য নিত্য উচ্চ মূল্য, আর বৃদ্ধদের হত্যা নাকি ছিল একেবারেই বিনা পয়সার খেলা।
গাভাজ্জেনির দাবি, ইতালির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সিসমি এ খবর আগেই পেয়েছিল। বসনিয়ার সামরিক কর্মকর্তা এদিন সুবাসিচ জানান, তিনি নিজেই সিসমিকে সতর্ক করেছিলেন। সিসমি নাকি দ্রুত এই অপারেশন থামিয়ে দেয়, কিন্তু পরে আর কখনও বিষয়টি আলোচনায় ওঠেনি।
অন্যদিকে সারায়েভোর সাবেক মেয়র বেনিয়ামিনা কারিচ ইতালির প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠিয়েছেন একটি পৃথক নথি, যেখানে তিনি এই বিদেশি হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সারায়েভোর বাসিন্দারা তবু অবাক নন। ডজেমিল হোজদিক, যিনি শিশু বয়সে যুদ্ধ দেখেছেন, বলেন, সপ্তাহান্ত এলেই শহরে ছড়িয়ে পড়ত ভয়ের দমচাপা বাতাস। গুজব ছিল, বাইরের কেউ কেউ নাকি আনন্দ করতে আসে, গুলি চালাতে আসে। তার ভাইও একদিন টেনিস খেলতে খেলতে স্নাইপারের গুলিতে মারা যায়। আজও পরিবার জানে না গুলি কার বন্দুক থেকে ছুটেছিল — সেই ভাড়াটিয়া শিকারিদের কারও, নাকি অন্য কারও।
এই অমানবিক ভ্রমণে নাকি শুধু ইতালীয়রা নয়, আরও নানা দেশের মানুষ অংশ নিত। বসনীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মিরান জুপানিচ তার ডকুমেন্টারিতে দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কয়েকজন ধনী ব্যক্তি সারায়েভোর উপর দিয়ে গুলি ছুঁড়তে এসেছিলেন। রাশিয়ান লেখক এডুয়ার্ড লিমোনভকে ১৯৯২ সালে চিত্রায়ণে দেখা যায় শহরের দিকে মেশিনগান তাক করে গুলি চালাতে। এমনকি ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে এক সাবেক মার্কিন মেরিন সাক্ষ্য দেন, তিনি নিজ চোখে দেখেছেন পর্যটক স্নাইপারদের, যাদের পোশাক ও আচরণ স্পষ্টই বলে দিচ্ছিল তারা যুদ্ধক্ষেত্রের মানুষ নন।
ইতালির এই নতুন তদন্ত হয়তো বহু বছরের লুকোনো সত্যের দরজায় আবার আঘাত করছে। যারা সারায়েভোকে নিয়মিত রক্তে ভাসিয়েছে, তাদের মুখোশ খুলে পড়বে কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু নিহতদের পরিবারের ব্যথা আজও একই — তারা জানে, সেই চার বছরের অবরোধে মৃত্যু ছিল প্রতিদিনের অতিথি, আর হত্যাকারীরা পৃথিবীর কোথাও নিশ্চিন্তে দিন কাটিয়েছে।
তবু একটি আশার আলো জ্বলে ওঠে। বসনিয়া সরকার জানিয়েছে, তারা ইতালির সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতায় কাজ করছে। হয়তো এবার সত্যি সত্যিই অতীতের সেই অমানবিক রাতগুলোকে নথিবদ্ধ করা হবে। আর যারা মানুষ হত্যাকে বিনোদন ভেবেছিল, তাদের নাম প্রকাশ পাবে ইতিহাসের অন্ধকার কোণে।
















