তেহরান, ইরান – একের পর এক বাঁধ শুকিয়ে যাচ্ছে, নদীগুলো হারিয়ে ফেলছে প্রবাহ, আর রাজধানী তেহরান তৃষ্ণার্ত এক শহরে পরিণত হচ্ছে। দেশজুড়ে মানুষ পানির অভাবে দিশেহারা, সরকার হন্যে হয়ে চেষ্টা করছে রাজধানীতে পানীয় জল সরবরাহ চালিয়ে রাখতে।
রাষ্ট্রপতি মাসউদ পেজেশকিয়ান শুক্রবার এক ভাষণে সতর্ক করেছেন, আগামী মাসে যদি বৃষ্টি না হয়, তবে রাজধানীতে পানির রেশনিং শুরু করতে হবে— এমনকি তেহরানের এক কোটি মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহর খালি করার সিদ্ধান্ত হয়তো বাস্তবে হবে না, কিন্তু এমন সতর্কবার্তা ইরানের ভয়াবহ পরিস্থিতির গভীরতাই প্রকাশ করছে। নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি, ছয় বছর ধরে চলমান খরা আর চরম তাপমাত্রা দেশটিকে ধীরে ধীরে শুকিয়ে ফেলছে।
এক অবিরাম খরার দেশে
গত ছয় বছর ধরে ইরানে একটানা খরা চলছে। এবারের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ শেষ হওয়া পানি বর্ষপঞ্জির তথ্য বলছে, এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে শুষ্ক বছরগুলোর একটি। নভেম্বরের প্রথম দিকে ইরান পেয়েছে মাত্র ২.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি—স্বাভাবিকের তুলনায় ৮১ শতাংশ কম।
ইরানের ১৯টি বাঁধ এখন প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। তেহরানের পানির প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত লার, লাতিয়ান, করাজ, তেলেগান ও মামলু বাঁধে পানি রয়েছে গড়ে মাত্র ১০ শতাংশ। করাজ জলাধারের তলদেশে এখন মানুষ হাঁটছে— এমন ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
আকাশের দিকে চেয়ে থাকা আশা
বৃষ্টি ছাড়া কোনো বিকল্প পথ নেই। তুফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ও এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ফারশিদ ভাহেদিফারদ বলেছেন, “যদি পর্যাপ্ত বৃষ্টি বা তুষারপাত না হয়, তবে মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি ভয়াবহ হবে।”
তিনি আরও সতর্ক করেছেন, পানির সংকট এখন সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে এই সংকট মিলে গেলে বড় ধরনের প্রতিবাদের ঝুঁকি বাড়বে।
রাতের অন্ধকারে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া পানি
জ্বালানি মন্ত্রী আব্বাস আলিয়াবাদি জানিয়েছেন, সরকার শিগগিরই দেশজুড়ে পানির রেশনিং শুরু করবে এবং প্রয়োজনে রাতে পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। ইতোমধ্যেই রাজধানীর কিছু এলাকায় রাতের বেলা পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে নাগরিকরা অভিযোগ করেছেন।
মন্ত্রী বলেন, “যারা অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করছেন, তাদের শাস্তি দেওয়া হবে।” তিনি মানুষকে পানি সংরক্ষণের জন্য ট্যাংক কিনতে বলেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনগণকে দোষারোপ করে সমাধান আসবে না— কারণ গৃহস্থালি ব্যবহারে দেশের মোট পানির মাত্র ৮ শতাংশ খরচ হয়, বাকি ৯০ শতাংশ যায় কৃষিখাতে।
আত্মনির্ভরতার মায়াজালে কৃষির শ্বাসরোধ
ইরানি আইনে বলা আছে, দেশের ৮৫ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন স্থানীয়ভাবে হতে হবে। কিন্তু ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতায় ইরানের কাছে পর্যাপ্ত পানি বা উর্বর মাটি নেই। পুরনো সেচব্যবস্থা, ভুল ফসল নির্বাচন এবং অবকাঠামোর ঘাটতিতে প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগেই শিল্পায়নের চাপে পানি সম্পদ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিপ্লবের পর “খাদ্যে আত্মনির্ভরতা”র নীতিতে সেই চাপ আরও বেড়েছে। এখন কৃষি খাত ইরানের মোট জিডিপির মাত্র ১২ শতাংশ দেয়, অথচ খরচ করে দেশের ৯০ শতাংশ পানি।
অযত্নে হারানো সম্পদ
ইরানের মাটির নিচের পানির স্তর ভয়াবহভাবে নেমে গেছে। শত শত বাঁধ ও কূপ খনন করে নদী ও ভূগর্ভস্থ জলাশয়ের ভারসাম্য নষ্ট করা হয়েছে। তেহরানসহ বড় শহরগুলো তাদের চাহিদা মেটাতে দূরের জলাধার থেকে পানি টানছে, পুরনো পাইপলাইনে লিক হয়ে অপচয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পানি।
সরকার অস্থায়ী সমাধান হিসেবে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ ও জলাধার সংযোগ প্রকল্পে কাজ করছে, কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুরদৃষ্টির অভাবে পরিস্থিতি এখন প্রায় “অফেরতযোগ্য” অবস্থায় পৌঁছেছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
ন্যায়সঙ্গত পানিব্যবস্থাপনা প্রয়োজন
অধ্যাপক ভাহেদিফারদ বলেন, এখন সময় এসেছে সরবরাহ নয়, টিকে থাকার দৃষ্টিকোণ থেকে পানিব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার। ভূগর্ভস্থ পানি পুনরুদ্ধার, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং পানি-জ্বালানি-কৃষি নীতির সমন্বয়ই পারে ইরানকে বাঁচাতে।
তেহরানের কান নদী এখন সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। পাহাড়ের বুকে যে জলধারা একসময় শহরকে বাঁচিয়ে রাখত, আজ তা পরিণত হয়েছে ধুলোর সমুদ্রে। ইরানের মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে— হয়তো এক মেঘের ছায়ার আশায়, হয়তো এক ফোঁটা বৃষ্টির প্রার্থনায়।
















