তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেওয়ার পাঁচ বছর পর দেশটির নারীদের জীবন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী তালেবান কর্মকর্তার সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের সাক্ষাৎ ও সরেজমিন অভিজ্ঞতায় দেশটির শাসনব্যবস্থার নানা দিক তুলে ধরেছে বিবিসি।
উত্তরাঞ্চলের একটি প্রদেশে তালেবান গভর্নরের কার্যালয়ে এক তরুণী তাঁর স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদের আবেদন নিয়ে হাজির হন। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর নির্যাতন ও মারধরের শিকার হয়েছেন। গভর্নর তাঁকে সংসার টিকিয়ে রাখার পরামর্শ দিলেও তরুণী নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি জানান, তাঁর সম্মান ও মর্যাদা ইতোমধ্যে নষ্ট হয়েছে।
তালেবান শাসনে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা সীমিত এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত। একা ভ্রমণ, উদ্যান ও বিনোদনকেন্দ্রে যাওয়া নিয়েও নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীদের বড় একটি অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
তালেবানের বর্তমান নেতারা দাবি করেন, নারীদের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ধর্মীয় আইনের কাঠামোর মধ্যেই বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বন্ধ রাখার নীতির কারণে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
তালেবানের এক জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র বলেন, নারীদের দপ্তরে পুরুষদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিলে নৈতিক সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নারীদের শিক্ষা পুনরায় চালুর বিষয়টি ধর্মীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধানের মাধ্যমে বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। তালেবান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমকে এমন কোনো প্রচার করা যাবে না, যা ইসলামি আইন ও ধর্মীয় রীতিনীতির বিরুদ্ধে যায়। বিভিন্ন সাংবাদিক জানিয়েছেন, তাঁদের তালেবানের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
তালেবান শাসনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন কর্মকর্তার অতীতও সামনে এসেছে। উত্তরাঞ্চলের এক গভর্নর অতীতে তালেবানের সামরিক কমান্ডার ছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গুয়ানতানামো বন্দিশিবিরে কয়েক বছর আটক ছিলেন। তিনি অতীতে বামিয়ান এলাকায় প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথাও স্বীকার করেছেন।
রাজধানীতে তালেবানের আরেক কর্মকর্তা জানান, তিনি অতীতে আত্মঘাতী হামলাকারীদের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তালেবানের আগের বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডে বহু মানুষ নিহত হলেও অতীতের নির্দিষ্ট হামলা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।
একটি উপজাতীয় অনুষ্ঠানে তালেবানের সাবেক এক যোদ্ধার প্রশংসার পাশাপাশি মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় ও শিক্ষার সুযোগ পুনরায় চালুর দাবি ওঠে। বক্তব্যের পর পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে পড়ে এবং বক্তাকে আর কথা বলতে দেওয়া হয়নি। পরে তিনি জানান, ইসলাম অনুযায়ী নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য জ্ঞান অর্জন করা বাধ্যতামূলক।
তালেবান শাসনের পাঁচ বছর পরও আফগানিস্তানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট বড় সমস্যা হয়ে আছে। জাতিসংঘের হিসাবে, দেশটির প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে প্রায় তিনজনই নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ পানি, সড়ক ও চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো মৌলিক সুবিধার অভাবের কথাও জানিয়েছেন।
তালেবান কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তাঁরা এসব সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করছেন। তবে দেশটির কিছু মানুষ মনে করেন, বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণই তালেবানের শাসনব্যবস্থা।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার সময় যারা প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের কয়েকজন জানিয়েছেন, শিক্ষা ও স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ তাঁদের জীবন ও ভবিষ্যতের স্বপ্নকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, নারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে। তবে তাঁরা মনে করেন, শিক্ষিত নারীদের ওপর দীর্ঘদিন এভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হবে না।
পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের চিত্র তাই একদিকে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি, অন্যদিকে নারী অধিকার, শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং মানবিক সংকটের গভীর বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।
















