সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জর্ডানে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান রোমান গোফম্যানের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন।
সিরিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে জানা গেছে, বৈঠকে ইসরায়েলের হামলা, গ্রেপ্তার ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান বন্ধের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চুক্তির আলোচনা পুনরায় চালু করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্যকার উত্তেজনা যেন দেশটির ভূখণ্ডে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি তুরস্ক সীমান্তের কাছে একটি সিরীয় বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সিরিয়ায় ইসরায়েল শত শত হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি গোলান মালভূমিতে ইসরায়েল-সিরিয়া বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের বাফার এলাকায় ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ইদলিবে আবু দাহর বিমানঘাঁটিতেও ইসরায়েল হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি, তুরস্কের সেনা মোতায়েন ঠেকাতেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। তবে সিরিয়া ও তুরস্ক উভয়েই এই দাবি অস্বীকার করেছে।
বৈঠকে সিরিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিরিয়া একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব সেনাবাহিনী পুনর্গঠন, উন্নয়ন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও অংশীদারত্ব নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে। এই অধিকার সীমিত করে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না বলেও তারা স্পষ্ট করেছে।
সিরিয়ার তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে আসাদ সরকারের পতনের আগে ইসরায়েলি বাহিনী যে অবস্থানে ছিল সেখানে ফিরে যাওয়া এবং উনিশশো চুয়াত্তরের বিচ্ছিন্নতা চুক্তি পুরোপুরি পুনর্বহাল করা। পাশাপাশি ইসরায়েল-অধিকৃত গোলান মালভূমির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছে দামেস্ক।
অন্যদিকে ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৈঠকটি ইতিবাচক ছিল। তবে আলোচনায় যাওয়ার আগে ইসরায়েল কয়েকটি শর্তকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা হিসেবে তুলে ধরেছে।
এর মধ্যে রয়েছে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক তৎপরতা ঠেকানো, গোলান মালভূমির সিরীয় অংশকে সামরিকভাবে নিরস্ত্রীকরণ, দ্রুজ সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সিরীয় সেনাবাহিনীর নির্দিষ্ট কৌশলগত অস্ত্র অর্জন ঠেকানো।
ইসরায়েল আরও জানিয়েছে, সিরিয়ার দখল করা অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি কূটনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত কয়েক দফা আলোচনায় সিরিয়া ও ইসরায়েল উত্তেজনা কমাতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একটি যৌথ ব্যবস্থা নিয়ে সম্মত হয়েছিল। তবে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সেই আলোচনা স্থবির হয়ে যায়।
বৈঠকের আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েলের ওপর আস্থার ঘাটতির কথা জানালেও কূটনীতির দরজা খোলা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতেই দক্ষিণ সিরিয়ায় নিরাপত্তা অঞ্চল এবং জাতিসংঘের বাহিনী নিয়ন্ত্রিত বাফার অঞ্চলসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই পক্ষ প্রায় পূর্ণাঙ্গ সমঝোতায় পৌঁছেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান ম্নেইমেনেহ মনে করেন, বর্তমান আলোচনা দ্রুত উত্তেজনা কমাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তার মতে, সিরিয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আগ্রহ দেখালেও ইসরায়েল নতুন দাবি সামনে আনতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে সেগুলো নিয়ে দামেস্কের সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারে।
তার মতে, সিরিয়া আশঙ্কা করছে দেশটি ইসরায়েল ও তুরস্কের সংঘাতের একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি ও সম্প্রসারণ নিয়েও দামেস্ক উদ্বিগ্ন।
সিরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের আরও ভাঙন ঠেকানো এবং ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্ভাব্য সংঘাত যাতে দেশের পুনর্গঠন ও নতুন রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা।
















