ভারতের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী টাটার শীর্ষ পদ এখন শূন্য। টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরনের পদত্যাগের পর তাঁর উত্তরসূরি বাছাই নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। কয়েক হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ, লোকসানে থাকা নতুন ব্যবসা এবং টাটা ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে নতুন চেয়ারম্যানের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
চন্দ্রশেখরনের পদত্যাগের পেছনে পুনর্নিয়োগ নিয়ে মতবিরোধ এবং টাটা ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। টাটা সন্সের মালিকানায় নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকা থাকা এই দাতব্য সংস্থার সঙ্গে টাটা গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক কৌশল, কোম্পানিটিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা এবং নতুন ব্যবসাগুলোতে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাটা গোষ্ঠী বড় ধরনের বিনিয়োগের পথে এগিয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর কারখানা নির্মাণ, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদন, বিমান ব্যবসার সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু নতুন কয়েকটি ব্যবসা এখনো লোকসানে রয়েছে। ফলে নতুন চেয়ারম্যানকে একদিকে এসব বিনিয়োগের ঝুঁকি সামলাতে হবে, অন্যদিকে কোন প্রকল্প চালু রাখা, কোনটিতে বিনিয়োগ কমানো কিংবা কোনটি থেকে সরে আসা হবে—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি টাটা ট্রাস্ট ও টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদ—দুই পক্ষের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন। পাশাপাশি নতুন ব্যবসার ধরন বুঝতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। এত বৈচিত্র্যময় ও বড় একটি ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা খুবই সীমিত।
গোষ্ঠীটির পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাগুলোর মধ্যে ইস্পাত, গাড়ি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আগে যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসা টাটা গোষ্ঠীর অর্থপ্রবাহের প্রধান ভিত্তি ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের কারণে সেই অবস্থানও আগের মতো শক্তিশালী নেই। একই সময়ে নতুন ব্যবসাগুলোর সম্মিলিত লোকসান পুরোনো ব্যবসাগুলো থেকে আসা নগদ অর্থের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
নতুন চেয়ারম্যানের আরেকটি বড় দায়িত্ব হবে বিনিয়োগকারীদের সামনে স্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরা। কোন লোকসানি ব্যবসাকে লাভজনক করার চেষ্টা করা হবে, কোথায় বিনিয়োগ কমানো হবে এবং কখন এসব প্রকল্প থেকে মুনাফা আসতে পারে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে টাটা ট্রাস্ট ও টাটা সন্সের মধ্যে সমন্বয় ফিরিয়ে আনা। অতীতে জেআরডি টাটা ও রতন টাটার সময়ে মালিকপক্ষ এবং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ছিল। পরে দায়িত্বের বিভাজন নিয়ে সেই সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। চন্দ্রশেখরনের পদত্যাগকে টাটা ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের দ্বিতীয় বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান মালিকপক্ষ যদি ব্যবসায়িক কৌশলের সঙ্গে নিজেদের অবস্থানকে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে না করে, তাহলে বড় একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নতুন চেয়ারম্যানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা ও সমন্বয় পুনর্গঠন করা।
চন্দ্রশেখরনের পদত্যাগ ইতোমধ্যে টাটা গোষ্ঠীর ভাবমূর্তিতে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং ব্যবসার দিকনির্দেশনা নিয়ে এখনো বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি টাটা সন্সের বার্ষিক সাধারণ সভাও প্রয়োজনীয় উপস্থিতি না থাকায় স্থগিত হয়েছে।
ফলে ভারতের অন্যতম পরিচিত এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নতুন প্রধান শুধু একজন উত্তরসূরি হবেন না; তাঁকে একই সঙ্গে নেতৃত্বের সংকট সামলানো, লোকসানি ব্যবসাগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং টাটা ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে।
















