বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এয়ার কন্ডিশনিং) শুধু আরাম নয়, জনস্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। তবে এর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ব্যয়ও কম নয়। যুক্তরাজ্যের উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টের ১২৩ বছর পুরোনো একটি হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজও আধুনিক বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করছে।
১৯০৩ সালে নির্মিত বেলফাস্টের রয়্যাল ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল বিশ্বের প্রথম দিকের যান্ত্রিকভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জনসাধারণের ভবনগুলোর একটি। বিশাল লোহার ফ্যান, ভেজানো নারকেলের আঁশের দড়ি এবং বিশেষ বায়ু চলাচল ব্যবস্থার মাধ্যমে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে ঠান্ডা ও আর্দ্রতানিয়ন্ত্রিত বাতাস পৌঁছে দেওয়া হতো। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল রোগীদের দ্রুত সুস্থ করে তোলা এবং সংক্রমণ ও দূষণের ঝুঁকি কমানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে তীব্র গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর শুধু ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যেই এয়ার কন্ডিশনিং প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার তাপজনিত মৃত্যু প্রতিরোধ করে। আবার তীব্র তাপপ্রবাহের সময় হাসপাতালে কার্যকর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ রোগীর মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন জনসাধারণের জন্য ‘কুলিং সেন্টার’ বা শীতল আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলছে। ভারতের যোধপুরে সৌরবিদ্যুৎচালিত ও খাস ঘাসের ভেজা পর্দা ব্যবহার করে এমন কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, যেখানে বাইরের তুলনায় ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম রাখা সম্ভব। স্পেন জলবায়ু আশ্রয়কেন্দ্রের জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ছে, আর লন্ডনে শীতল ভবনগুলোর ডিজিটাল মানচিত্র চালু করা হয়েছে।
তবে এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ব্যাপক ব্যবহারের নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের প্রায় ৭ শতাংশ ব্যয় হয় এয়ার কন্ডিশনিংয়ে এবং এটি বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের উল্লেখযোগ্য উৎস। পাশাপাশি অনেক রেফ্রিজারেন্ট গ্যাসের উষ্ণায়ন ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় হাজার গুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবনের ছাদ সাদা রঙ করা, ছায়া সৃষ্টি, উন্নত নিরোধক (ইনসুলেশন) এবং প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের মতো ‘প্যাসিভ কুলিং’ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবণ শহরগুলোতে এগুলো একাই যথেষ্ট নয়। হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আধুনিক, শক্তি-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
১৯০৩ সালের সেই ঐতিহাসিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজ আর ব্যবহার করা না হলেও এটি মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শুধু আরাম নয়, সংকটের সময় অসংখ্য মানুষের জীবনও রক্ষা করতে পারে।
















