দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) আওতায় প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নরসিংদীর পলাশে ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত আধুনিক এ কারখানাটি দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণ এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে উদ্বোধনের পর ২০২৪ সালের ১১ মার্চ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে কারখানাটি।
প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন এবং বছরে ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে কারখানাটির। উৎপাদন শুরুর প্রথম বছরেই লাভের মুখ দেখলেও সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস সংকটের কারণে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, চলতি অর্থবছরে ৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ৪০ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কম উৎপাদন হয়েছে।
কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, কারখানাটি সচল রাখতে প্রতিদিন ৭২ এমএমসিএফডি গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু চলতি বছরের ৪ মার্চ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ১ এপ্রিল গ্যাস সংযোগ পুনঃস্থাপনের পর ৬ এপ্রিল আংশিক এবং ৯ এপ্রিল থেকে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু হয়। দীর্ঘ ৪০ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকাই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যাহত হলেও কারখানার যন্ত্রপাতি সচল রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে নির্ধারিত উৎপাদন অর্জনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
কারখানা সূত্র জানায়, আগে দৈনিক ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষম ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানা এবং ৩০০ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষম পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা দীর্ঘদিন লোকসানে চলছিল। পরে দুটি কারখানা ভেঙে একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব সমন্বিত কারখানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। নতুন কারখানাটি চালু হওয়ার পর উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়।
উৎপাদন শুরুর প্রথম অর্থবছরেই প্রতিষ্ঠানটি ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি মালিকানাধীন পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে এটিই ছিল একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয় ছিল ২ হাজার ৬৩২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সার বিক্রি থেকে এসেছে ১ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা এবং সরকারি ভর্তুকি থেকে ৮৯৯ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে পরিচালন মুনাফা হয় প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা। এ ছাড়া এফডিআর ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা আয় হয়। সব ব্যয় ও ঋণের সুদ পরিশোধের পর নিট মুনাফা দাঁড়ায় ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
এর আগের অর্থবছরে উৎপাদন শুরু না হওয়ায় ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও ঋণের সুদের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ৩৩৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ থাকায় প্রথম বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং মুনাফা করা সম্ভব হয়েছিল। তবে গ্যাস সংকটের কারণে চলতি অর্থবছরে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়নি।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ এখনও ১২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণ ১০ হাজার ২৯৫ কোটি এবং সরকারের এডিপি ঋণ ১ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। শুধু গত অর্থবছরেই ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি ঋণে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের ঋণ উৎপাদিত ইউরিয়া সার বিক্রির অর্থ থেকেই পরিশোধ করা হচ্ছে। উৎপাদন শুরুর পর এ পর্যন্ত মোট নয়টি কিস্তি পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের আশা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং যন্ত্রপাতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে শুধু লক্ষ্যমাত্রাই অর্জন নয়, তা অতিক্রম করাও সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে এবং ইউরিয়া সার আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার গুরুত্ব অনেক। তাই কারখানাটির পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের বিকল্প নেই।
















