ইরাক জুড়ে আবারও গণতন্ত্রের হাওয়া বইছে। দীর্ঘ অস্থিরতা ও রক্তাক্ত অতীতের স্মৃতি ছাপিয়ে আজ ভোটের উৎসব শুরু হয়েছে—নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য বিশেষ ভোটগ্রহণ চলছে সারা দেশে।
রবিবার সকাল সাতটা থেকে শুরু হয় ভোটগ্রহণ, যা চলবে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। প্রায় তেরো লাখ নিরাপত্তা সদস্য ভোট দিচ্ছেন ৮০৯টি কেন্দ্রজুড়ে। মঙ্গলবারের সাধারণ ভোটের আগে এই বিশেষ ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, কারণ নির্বাচনের দিনে তারা দেশজুড়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন।
এছাড়া, প্রায় ছাব্বিশ হাজারের বেশি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষও আজ ভোট দিচ্ছেন—ইরাকের ২৭টি স্থানে ৯৭টি ভোটকেন্দ্রে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ইরাকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল আমির আল শাম্মারি জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে ও সুশৃঙ্খলভাবে চলছে। মানুষের মুখে দেখা যাচ্ছে প্রত্যাশার ছাপ, যেন প্রতিটি ব্যালটে লিখে রাখা হচ্ছে ভবিষ্যতের আশার গল্প।
মঙ্গলবারের সাধারণ নির্বাচনে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ভোটার ভোট দেবেন দেশের ৪৫০১টি কেন্দ্রে। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাত হাজার সাতশরও বেশি প্রার্থী, যাদের এক-তৃতীয়াংশ নারী। আইন অনুযায়ী, সংসদের ২৫ শতাংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত, আর নয়টি আসন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য নির্ধারিত।
বর্তমান সংসদের মেয়াদ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি, যা শেষ হবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে। এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২৩ সালে পুনরুজ্জীবিত একটি পুরনো নির্বাচনী আইন অনুযায়ী—যা অনেকেই মনে করেন বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে সুবিধাজনক।
২০২১ সালের নির্বাচনে যেখানে ৭০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন, এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী মাত্র ৭৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, ভোটারদের আগ্রহ এবার আরও কম হতে পারে—২০২১ সালে যেখানে ভোট পড়েছিল মাত্র ৪১ শতাংশ।
নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে ঘুষ, দুর্নীতি ও প্রভাব খাটানোর নানা অভিযোগ উঠেছে। ভোট কর্মকর্তারা ৮৪৮ জন প্রার্থীকে বাতিল করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে—যেমন ধর্মীয় আচার বা সেনাবাহিনীকে অপমানের অভিযোগে।
অতীতের মতো সহিংসতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আগের নির্বাচনগুলোয় প্রার্থী হত্যাকাণ্ড, ভোটকেন্দ্রে হামলা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষ ঘটেছে বহুবার। এবারও এক প্রার্থীকে হত্যার খবর পাওয়া গেছে নির্বাচনের আগমুহূর্তে।
শিয়া নেতা মুকতাদা সাদর আবারও তার অনুসারীদের এই নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন, একে বলেছেন “ত্রুটিপূর্ণ ও অবিশ্বাসযোগ্য”। ২০২১ সালের নির্বাচনে তার জোটই জয়ী হয়েছিল, কিন্তু সরকার গঠনের সমঝোতা না হওয়ায় তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।
তবুও, অনেকেই মনে করছেন সময়মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া ইরাকের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ইতিবাচক ইঙ্গিত। দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম বলেন, “ইরাকের পথচলা সহজ নয়, তবু এই নির্বাচন প্রমাণ করে দেশটি গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হচ্ছে। তবে এখনো তারা ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।”
প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল সুদানি, যিনি ২০২২ সালে প্রো-ইরান গোষ্ঠীর সমর্থনে ক্ষমতায় আসেন, এবার দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান এখন আরও দৃঢ়, ফলে ইরানের প্রভাব ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে। এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকি ও ধর্মীয় নেতা আম্মার আল হাকিমও রয়েছেন সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায়।
ইরাকের রাজনৈতিক প্রথা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হন একজন শিয়া মুসলমান, সংসদের স্পিকার হন সুন্নি, আর রাষ্ট্রপতি পদটি যায় কুর্দিশ নেতাদের হাতে।
আজকের ইরাক যেন আবারও ইতিহাসের এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধ, রক্তপাত ও বিভেদের ছায়া পেরিয়ে দেশটি খুঁজছে নতুন ভোরের আলো—একটি এমন ভবিষ্যৎ, যেখানে ভোটের কালি হতে পারে মুক্তির প্রতীক।
















