দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাগর আবারও বয়ে আনল শোকের ঢেউ। মালয়েশিয়ার উপকূলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বহনকারী একটি নৌকা ডুবে গেছে, এখন পর্যন্ত অন্তত সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে—এর মধ্যে পাঁচজন নারী ও এক কিশোরী। শতাধিক মানুষ এখনও নিখোঁজ, আর তাদের প্রিয়জনেরা অপেক্ষা করছেন তীরে, এক অসম্ভব আশার প্রহর গুনে।
রবিবার সকালে মালয়েশিয়ার সামুদ্রিক সীমান্তে ঘটে এই দুর্ঘটনা। মালয়েশিয়ার সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা এমএমইএর আঞ্চলিক প্রধান রমলি মুস্তাফা জানান, ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, তবে অন্তত দু’টি নৌকার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নৌকাটি থাইল্যান্ডের তারুতাও দ্বীপের কাছে, মালয়েশিয়ার লাংকাউই দ্বীপের উত্তরে ডুবে যায়। প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা তিন দিন আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে একাধিক নৌকায় যাত্রা শুরু করেছিল বলে জানা গেছে। সীমান্তের কাছাকাছি এসে তাদের বড় নৌকা থেকে ছোট তিনটি নৌকায় ওঠার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতিটিতে প্রায় একশো জন করে মানুষ ছিলেন।
কেদাহ রাজ্যের পুলিশ প্রধান আদজলি আবু শাহ জানান, “দুটি নৌকা এখনো নিখোঁজ। সমুদ্রজুড়ে অনুসন্ধান অভিযান চলছে, যা প্রায় ১৭০ বর্গনটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত।”
এমএমইএ প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, উদ্ধার হওয়া এক ব্যক্তিকে স্ট্রেচারে করে নেওয়া হচ্ছে, আরেকজন কম্বলে ঢাকা অবস্থায় শুয়ে আছেন।
রমলি মুস্তাফা বলেন, “অবৈধ মানবপাচার চক্রগুলো এখন আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা এসব অসহায় শরণার্থীদের বিপজ্জনক সমুদ্রপথে ঠেলে দিচ্ছে, প্রতিজনের কাছ থেকে নিচ্ছে হাজার হাজার ডলার।” রিপোর্ট অনুযায়ী, একেকজন রোহিঙ্গাকে এই যাত্রার জন্য দিতে হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার ডলার।
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক রব ম্যাকব্রাইড জানান, “রোহিঙ্গারা রাখাইন উপকূল থেকে তিন দিন আগে যাত্রা শুরু করেছিল। তারা মালয়েশিয়ায় আসতে চেয়েছিল নতুন জীবনের আশায়, যেখানে তাদের অনেক আত্মীয় বা পরিচিত আগে থেকেই আছে।”
মালয়েশিয়ায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লক্ষাধিক অভিবাসী ও শরণার্থী কাজ করে—অধিকাংশই অনথিভুক্ত, নির্মাণ ও কৃষিক্ষেত্রে কঠিন পরিশ্রমে বেঁচে থাকে।
রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারে বরাবরই পরবাসীর মতো জীবন যাপন করে। নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত, নিপীড়িত এবং প্রায়ই সহিংসতার শিকার এই জনগোষ্ঠীর একাংশ প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে—যেখানে প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা এখন আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার অস্থিতিশীলতায় ডুবে আছে। গৃহযুদ্ধ, দমন-পীড়ন ও অনিশ্চয়তার মাঝেই অনেকে পালাচ্ছে জীবন বাঁচাতে। কিন্তু সেই পালানোই এখন মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হচ্ছে—অশ্রু ও লাশের সমুদ্র তৈরি করছে বঙ্গোপসাগরের বুকজুড়ে।
রমলি বলেন, “মিয়ানমারের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, মানুষ এখন জীবন বাজি রেখে সমুদ্রের অনিশ্চিত পথে পাড়ি জমাচ্ছে।”
অতীতে এমন ট্র্যাজেডি নতুন নয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়ার উপকূলে একাধিক নৌকা ডুবে প্রাণ হারিয়েছিল ২০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা।
আজ আবারও সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হলো—একই সমুদ্র, একই কান্না, একই প্রশ্ন।
মানুষ কেন বারবার পালায়?
আর কতদিন এই সাগর শরণার্থীদের নিঃশব্দ মৃত্যু বহন করবে?
















