গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা নিয়ে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনের নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক ভারতীয় বিচারক শ্রীনিবাসন মুরালিধর আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছেন। দীর্ঘ বিচারিক জীবনে ধর্মীয় দাঙ্গা, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর এবার তিনি গাজা যুদ্ধের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত একটি বহুল আলোচিত প্রতিবেদনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধীন স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় যুদ্ধ চলাকালে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত ও আহত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, খাদ্য ও মানবিক সহায়তার ওপর অবরোধ, চিকিৎসা অবকাঠামোর ক্ষতি এবং মাতৃ ও নবজাতক সেবাকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরেও শিশুদের বিরুদ্ধে আটক, নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিশনের নেতৃত্বদানকারী মুরালিধর বলেছেন, তদন্তে সংগৃহীত তথ্য শিশুদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক হামলার অভিযোগের দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যেসব রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান কোনো সংঘাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা দেয়, তাদেরও দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
অন্যদিকে ইসরায়েল এই প্রতিবেদন সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিহিত করে দাবি করেছে, এতে হামাসের হামলায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ইসরায়েলি শিশুদের বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে এবং বাস্তব পরিস্থিতির একপাক্ষিক উপস্থাপন করা হয়েছে।
মুরালিধর জানান, প্রতিবেদন প্রকাশের পর ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো হুমকির মুখে পড়েননি। তবে কমিশনের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি ও চাপের অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ভারতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মুরালিধর মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা সংক্রান্ত একাধিক আলোচিত মামলার রায় দিয়েছেন। ধর্মীয় দাঙ্গা, সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা, গুমের অভিযোগ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তাঁর একাধিক সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। একটি দাঙ্গা-সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেওয়ার পর তাঁকে আকস্মিকভাবে অন্য উচ্চ আদালতে বদলি করা হয়, যা সে সময় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল।
পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন উচ্চ আদালতে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। অবসরের পর আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনে যুক্ত হয়ে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের নেতৃত্ব দেন তিনি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, গাজা যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং সম্ভাব্য জবাবদিহি নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্কের কেন্দ্রে এখন এই প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে মুরালিধরের দীর্ঘ বিচারিক জীবন ও মানবাধিকারবিষয়ক অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।















