নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জোহরান মামদানি। কিন্তু বিজয়ের আনন্দের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আক্রমণ—ওয়াশিংটনের রিপাবলিকান নেতারা বলছেন, তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা উচিত।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে মামদানিকে “কমিউনিস্ট” আখ্যা দিয়ে তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ট্রাম্প এমনকি হুমকি দেন—মামদানি মেয়র হলে নিউইয়র্কের ফেডারেল অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হবে।
রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান অ্যান্ডি ওগলেস ও র্যান্ডি ফাইন অভিযোগ তুলেছেন, মামদানি নাগরিকত্ব আবেদনপত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন এবং “সন্ত্রাসবাদে সহানুভূতিশীল”। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে মামদানির নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। ওগলেস বলেন, “যদি তিনি মিথ্যা বলে নাগরিকত্ব পান, তবে তাঁর মেয়র হওয়ার অধিকার নেই। এমন এক শহর এখন বিপদের মুখে, যেখানে এক কমিউনিস্ট ক্ষমতা নিতে চলেছে।”
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তথ্য অনুসারে, উগান্ডায় জন্ম নেওয়া জোহরান মামদানি ১৯৯৮ সালে সাত বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং ২০১৮ সালে নাগরিকত্ব লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে কোনো ব্যক্তি নাগরিক হতে হলে টানা পাঁচ বছর বৈধভাবে দেশে বসবাসের প্রমাণ দিতে হয়—যা মামদানি পূরণ করেছেন।
ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব বাতিল করা বা ‘ডিন্যাচারালাইজেশন’ প্রক্রিয়া আদালতের আদেশ ছাড়া সম্ভব নয় এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত বিরল ঘটনা। সাধারণত এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় যুদ্ধপরাধী নাৎসিদের বা স্বীকৃত সন্ত্রাসবাদে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।
অভিবাসন আইনজীবী জেরেমি ম্যাককিনি বলেন, “নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য সরকারকে স্পষ্ট, অখণ্ড প্রমাণ দিতে হয় যে আবেদনকারী ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলেছেন, এবং সেই তথ্যটি নাগরিকত্বের ফল পরিবর্তন করত। মামদানির ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রমাণ নেই।”
রিপাবলিকান নেতারা দাবি করেছেন, মামদানি তাঁর নাগরিকত্ব ফর্মে ‘ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা’ সংগঠনের সদস্যপদ উল্লেখ করেননি। তাঁদের মতে এটি কমিউনিস্ট সংগঠন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিজম ও কমিউনিজম এক নয়। এটি গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী, রাষ্ট্রীয় একনায়কত্বে নয়।
ওগলেস আরও অভিযোগ করেছেন, মামদানি ২০১৭ সালে লেখা এক র্যাপ গানে “হলি ল্যান্ড ফাইভ”-এর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন—যা ছিল হামাসকে সমর্থন করার অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ মুসলিম দাতব্যকর্মীর উল্লেখ। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিকে “মুক্ত মতপ্রকাশের অংশ” হিসেবে দেখছেন, সন্ত্রাসবাদের সমর্থন নয়।
মামদানির বিরুদ্ধে এই রাজনৈতিক প্রচারণাকে অনেকেই ইসলামফোবিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম অধিকার সংগঠন CAIR একে “বর্ণবাদী ও বিদ্বেষপ্রসূত” বলে নিন্দা জানিয়েছে। মামদানি নিজেও এমএসএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমেরিকান রাজনীতিতে ইসলামভীতি এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। মুসলিমদের এখানে থাকা নিয়েই অনেকে প্রশ্ন তোলে—এটাই বাস্তবতা।”
এদিকে নিউইয়র্ক ইয়াং রিপাবলিকান ক্লাব ১৪তম সংশোধনীর দোহাই দিয়ে মামদানির বিরুদ্ধে সাংবিধানিক পদক্ষেপের দাবি তুলেছে। তাদের মতে, মামদানি ‘রাষ্ট্রের শত্রুদের’ সহায়তা করেছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক নাটক—এমন অভিযোগ প্রমাণ করা আইনি দৃষ্টিতে প্রায় অসম্ভব।
আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব বাতিল করতে হলে সরকারকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে আবেদনকারী ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন এবং সেটি তাঁর নাগরিকত্বের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। বাস্তবে এমন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ।
কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাসান্দ্রা বার্ক রবার্টসন বলেন, “মামদানির বিরুদ্ধে এমন কোনো মামলা টিকবে না। বরং এতে সাধারণ মুসলিম ও অভিবাসীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি হতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।”
আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত একটাই—মামদানির নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি আইনি বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই, কেবল বিদ্বেষ ও ভয়ের রাজনীতি।















