রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই পারস্পরিক স্বার্থ, সন্দেহ এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেই সম্পর্ক এখন নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
প্রায় দুই শতক আগে রুশ সাম্রাজ্যের কূটনীতিক আলেকজান্ডার গ্রিবোয়েদভ তেহরানে নিহত হন। রাশিয়ায় তিনি এখনো একজন কিংবদন্তি কূটনীতিক হিসেবে স্মরণীয়। তার মৃত্যুর ঘটনা রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের গভীর অবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঊনবিংশ শতকে রুশ সাম্রাজ্য পারস্যের ভূখণ্ড দখল করে দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ায়। পরবর্তীতে ইরানকে ব্রিটিশ ও রুশ প্রভাবের প্রতিযোগিতার এক দুর্বল ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বিশ শতকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইরানের সম্পর্ক বারবার উত্তেজনা ও সমঝোতার মধ্যে দোদুল্যমান ছিল। ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান সোভিয়েত ইউনিয়নকে কখনো কখনো “ছোট শয়তান” বলেও উল্লেখ করত।
তবে সোভিয়েত পতনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ধরে রাখতে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করে। জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে মস্কো ভূমিকা রাখে। এর বিনিময়ে তেহরান রুশ অস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করে।
দুই দেশ যৌথভাবে তাজিকিস্তানের গৃহযুদ্ধের সমাধানেও ভূমিকা রাখে। পরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং পরিবহন করিডর প্রকল্পেও সম্পর্ক গভীর হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক কখনোই আদর্শিক নয়; বরং এটি “স্বার্থের বিয়ে”।
রাশিয়া একই সময়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইসরায়েলের আপত্তির কারণে মস্কো একসময় ইরানকে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ স্থগিতও করেছিল।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে দুই দেশ একসঙ্গে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে রক্ষা করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই জোটের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান শুরুতে নিরপেক্ষ থাকার কথা বললেও পরে রাশিয়াকে ড্রোন, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। রাশিয়া সেই ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে হামলা চালায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার পর রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবু মস্কো কখনোই সরাসরি সেনা পাঠানোর কথা ভাবেনি।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, রাশিয়া প্রয়োজনে ইউক্রেন ইস্যুতে ছাড় পাওয়ার বিনিময়ে ইরানকে ব্যবহার করতে চাইতে পারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতার কারণে সেই সম্ভাবনা এখন সীমিত।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়া হয়েছে, রাশিয়াকে নয়। এটিকে অনেকেই বৈশ্বিক কূটনীতিতে মস্কোর প্রভাব কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক এখনো টিকে আছে মূলত পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থানের কারণে। কিন্তু গভীর ঐতিহাসিক অবিশ্বাস, জ্বালানি বাজারে প্রতিযোগিতা এবং ভিন্ন আঞ্চলিক স্বার্থ এই জোটকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে তুলতে পারে।
















