রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আবারও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। চীন, ইরান এবং পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে তিনি নিজেকে বহুমেরুকেন্দ্রিক নতুন বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি বেইজিংয়ে পুতিনকে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের মধ্যে “পারস্পরিক আস্থা” ও “কৌশলগত সমন্বয়”-এর কথা উল্লেখ করেন। সফরে রাশিয়া ও চীন প্রযুক্তি ও বাণিজ্য খাতে বিশটির বেশি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে ইরান ঘিরে জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ায় রাশিয়া থেকে চীনে তেল রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। বর্তমানে চীন তার মোট অপরিশোধিত জ্বালানির প্রায় সত্তর শতাংশ আমদানি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফরটি পুতিনকে এমন একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে যেখানে রাশিয়া ও চীন নিজেদেরকে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।
শি জিনপিং ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার সমালোচনা করে তা “অগ্রহণযোগ্য” বলে উল্লেখ করেন এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান।
দুই নেতা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রেও স্বাক্ষর করেন, যেখানে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়। পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধিতা করে আসছেন।
তবে সমালোচকরা বলছেন, পুতিনের কর্মকাণ্ড ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। দুই হাজার আট সালে জর্জিয়ায় হামলা, দুই হাজার চৌদ্দ সালে ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখল এবং সাম্প্রতিক নতুন আইন রাশিয়ার আগ্রাসী অবস্থানকেই সামনে এনেছে।
অন্যদিকে, কয়েক মাস আগেও রাশিয়ার অর্থনীতি চাপে ছিল। বাজেট ঘাটতি বাড়ছিল, কর বৃদ্ধি করা হয়েছিল এবং ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলো তহবিল সংকটে পড়েছিল। খাদ্যপণ্যের দামও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছিল।
এই অবস্থায় ইরান যুদ্ধ পুতিনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়।
এর ফলে চীন, ভারত এমনকি জাপানও রাশিয়ার জ্বালানির প্রতি নতুন আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি এসেছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতিগুলোও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ভেনেজুয়েলা, ইরান, গ্রিনল্যান্ড এবং ন্যাটো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিশ্বব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমন বাস্তবতায় পুতিন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। তিনি সম্প্রতি রাশিয়ার জনগণকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার মতো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
তবে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাশিয়ার ভেতরে গভীর হতাশা তৈরি করছে। স্বাধীন জরিপে দেখা গেছে, শান্তি আলোচনার পক্ষে এখন অধিকাংশ রুশ নাগরিক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ও যুদ্ধ ক্লান্তি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
জনসংখ্যা সংকটও রাশিয়ার জন্য নতুন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জন্মহার কমে যাওয়ায় সরকার নাগরিকদের বেশি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানালেও তাতে সাড়া মিলছে না।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, দেশে ভয়ের সংস্কৃতি আরও জোরদার হয়েছে। বিরোধী মত দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার সংখ্যাও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার কথা বললেও পুতিনের কৌশল মূলত শক্তির রাজনীতিকেই সামনে আনছে। তবে অর্থনৈতিক চাপ, যুদ্ধের ক্লান্তি এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
















