ভারতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক কাগজে-কলমে এখনো স্থিতিশীল দেখালেও দেশটির অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। স্থবির মজুরি, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ভারতের অর্থনীতিকে নতুন চাপে ফেলছে।
এক আলোচনায় বিশ্লেষক এস শ্রীনিবাসন বলেন, ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট শুধু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের স্বর্ণ, জ্বালানি ও বিদেশ ভ্রমণে ব্যয় কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি “সহজ জীবনযাপন” ও “ব্যবসা সহজীকরণ”-এর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তবে শ্রীনিবাসনের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তব অর্থনৈতিক সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তাই বেশি। তার ভাষায়, মহামারিকালের মতো জনগণকে আসন্ন সংকটের জন্য প্রস্তুত করতেই সরকার এমন বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু ব্যয়সংকোচনের ওপর জোর দিয়ে সরকার মূল সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরেই ভারতের অর্থনৈতিক সমস্যা জমে উঠছে। সরকার অবকাঠামো খাতে বিপুল ব্যয় ও আয়কর ছাড় দিয়ে বাজারে চাহিদা বাড়ানোর চেষ্টা করলেও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি।
তার মতে, বড় বড় কোম্পানিগুলো বিপুল অর্থ হাতে রেখেও নতুন কারখানা স্থাপন বা কর্মসংস্থান বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে চাইছে না। উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারও মাঝামাঝি পর্যায়ে আটকে থাকায় নতুন মূলধনী বিনিয়োগে আগ্রহ কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ ভারত তার মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় পঁচাশি শতাংশ আমদানি করে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা বাড়লে ভারত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শ্রীনিবাসন সতর্ক করে বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু জ্বালানিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রান্নার গ্যাস ও সার সংকটও দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে কৃষি মৌসুমের আগে।
তিনি উনিশশো একানব্বই সালের বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টেনে বলেন, এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা আগের চেয়ে ভালো হলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির পরও অর্থনীতিতে গতি না থাকা বেশি উদ্বেগজনক।
তার মতে, রাজনৈতিকভাবে বর্তমান সরকার সফল হলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল দেখাতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, ভারতের দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি নীতিমালা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। ফলে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং বিনিয়োগের পাশাপাশি সমপরিমাণ অর্থ দেশ থেকে বেরিয়েও যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তিখাতে উদ্ভাবনের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, বিশ্ববাজারে ভারতকে এখন আর উদীয়মান অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, সামষ্টিক সূচক স্থিতিশীল থাকলেও দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
















