পাকিস্তানে জ্বালানি সংকট এখন শুধু বিদ্যুৎ বা শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও। বিশেষ করে নারীদের দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে গ্যাসের সময়সূচির ওপর। কখন গ্যাস আসবে আর কখন চলে যাবে—এ হিসাব করেই এখন দিন কাটছে বহু পরিবারের।
করাচির বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব ফারহাত কুরেশি জানান, আগে কখনো রান্না করতে ঘড়ি দেখে চলতে হয়নি। কিন্তু এখন সকাল শুরু হয় একটি প্রশ্ন দিয়ে—গ্যাস চলে যাওয়ার আগে কতটুকু রান্না শেষ করা যাবে।
তার বাসায় দিনে কয়েক দফায় অল্প সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ করা হয়। নির্ধারিত সময় মিস হলে রান্না পিছিয়ে যায়, খাবার বারবার গরম করতে হয় এবং পুরো দিনের পরিকল্পনা বদলে যায়।
ফারহাত বলেন, “আমার পুরো সকাল এখন গ্যাসকে ঘিরেই চলে। সময়মতো গ্যাস না এলে খুবই বিরক্ত লাগে। এভাবে জীবন চালানো ক্লান্তিকর।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার পর পাকিস্তানের জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল আকার নিয়েছে। বিশেষ করে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সংকট বেড়েছে।
করাচির বেশিরভাগ এলাকায় সকালে, দুপুরে ও সন্ধ্যায় সীমিত সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ করা হয়। তবে সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় কম চাপের কারণে রান্না শেষ করতেও বেশি সময় লাগে।
চব্বিশ বছর বয়সী শিক্ষক লাইবা জাহিদ জানান, এখন তার খাবারের সময়ও গ্যাসের ওপর নির্ভর করে। রাত নয়টার পর গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় পরিবারকে আগেভাগেই রাতের খাবার শেষ করতে হয়।
তিনি বলেন, “দুপুরে বাসায় ফিরেই খাবার গরম করতে হয়। দেরি হলে গ্যাস চলে যায়। তখন মাইক্রোওভেনে গরম করতে হয়, কিন্তু খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।”
তার মতে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে ঘুম ও বিশ্রামের। গ্যাসের সময়সূচি এখন ঠিক করে দেয় কখন খাওয়া হবে, কখন বাইরে যাওয়া যাবে কিংবা কখন বিশ্রাম নেওয়া যাবে।
ঘরে বসে খাবারের ব্যবসা পরিচালনা করা ফাতিমা হাফিজ জানান, পাইপলাইনের গ্যাস না থাকলে তাকে সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়, যা অনেক ব্যয়বহুল। কখনো কখনো বাড়তি খরচের কারণে অর্ডার বাতিলও করতে হয়।
তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটরও চালানো যায় না, কারণ সেটাও গ্যাসে চলে। ফলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
বাড়িতে ছোট সৌন্দর্যসেবা কেন্দ্র চালানো শাবানা হাসান জানান, গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটও তার কাজে বড় সমস্যা তৈরি করছে। সৌরবিদ্যুৎ থাকলেও সব যন্ত্র চালানো সম্ভব হয় না।
করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিমালাহ জাফর বাকাই বলেন, তার পুরো জীবন এখন দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে—গ্যাস ও বিদ্যুৎ। তিনি বলেন, “সারাদিন শুধু জানতে চাই, গ্যাস আছে কি না, কখন আসবে, কখন যাবে। অন্য কিছু ভাবার সুযোগই নেই।”
দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ফারহাত কুরেশি স্মরণ করেন সেই সময়ের কথা, যখন সারাদিন অবিরাম গ্যাস পাওয়া যেত এবং দুপুরের মধ্যেই রান্নার কাজ শেষ হয়ে যেত। এখন সেই কাজ টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
তার ভাষায়, “আমাদের ব্যক্তিগত জীবনও এতে প্রভাবিত হচ্ছে। পরিশ্রম অনেক বেড়ে গেছে।”
















