নিউইয়র্কে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। বিশ্বের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় শহরটির নেতৃত্বে এখন উঠেছেন জোহরান মামদানি—এক তরুণ, স্বপ্নময় রাজনীতিক, যিনি ভেঙে ফেলেছেন প্রাচীন রাজনৈতিক বৃত্ত, উজ্জ্বল করেছেন অভিবাসী প্রজন্মের মুখ।
মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে পরাজিত করে বিজয়ী হন মামদানি। এ জয় শুধু একটি রাজনৈতিক সাফল্য নয়—এ শহরের ইতিহাসে এক মানবিক মোড়, এক নতুন শুরু।
৩৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিক এখন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম নগরীর প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং প্রথম আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া মেয়র। উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে মামদানি বলেন, “আজ আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। নিউইয়র্ক, তুমি আজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছো।”
ভোটের ৯০ শতাংশ গণনা শেষে দেখা যায়, মামদানি পেয়েছেন ১০ লাখ ৩৩ হাজারেরও বেশি ভোট, যেখানে কুওমো পেয়েছেন ৮ লাখ ৫২ হাজার ভোট। রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া পেয়েছেন মাত্র ৭ শতাংশ ভোট।
কিন্তু মামদানির জয় শুধুমাত্র সংখ্যার নয়—এ এক আন্দোলনের জয়। তাঁর ভাষায়, “আমি বলছি ইয়েমেনি দোকানদারদের, মেক্সিকান দাদীদের, সেনেগালের ট্যাক্সিচালকদের, উজবেক নার্সদের, ত্রিনিদাদের রাঁধুনিদের, ইথিওপীয় খালাদের… তোমাদের সবার জন্য এই শহর, এই গণতন্ত্র।”
এই নির্বাচনে কুওমো ছিলেন পুরোনো গার্ড—এক ধনী দাতাদের প্রভাবিত রাজনীতির প্রতীক। আর মামদানি—এক তরুণ সমাজতন্ত্রী, যিনি কথা বলেছেন বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকারের।
কুওমো নিজেই বলেছিলেন, “এটা এক রাজনৈতিক গৃহযুদ্ধ, ডেমোক্র্যাট পার্টির আত্মার লড়াই।” কিন্তু রাতে ফল ঘোষণার পর তিনি পরাজয় স্বীকার করে বললেন, “আজকের রাত তাদের।”
জয়ের পর মামদানি ছিলেন দৃঢ় ও নির্ভীক—“আমি তরুণ, আমি মুসলিম, আমি একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী, এবং আমি এর জন্য কোনো ক্ষমা চাই না।”
ব্রঙ্কসের সমাজকর্মী জোশুয়া উইলসন বললেন, “তিনি নতুন, সৎ, আর পরিবর্তনের প্রতীক।”
ব্রুকলিনের ৬০ বছর বয়সী ড্রাইভার ইফতিখার খান, যিনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, গর্বভরে বললেন, “আমাদের সন্তানদের জন্য আজকের দিনটি এক আশার দিন। নিউইয়র্কে মুসলমানরা এখন নতুন ইতিহাস লিখছে।”
মামদানির প্রতিশ্রুতি—ফ্রি পাবলিক বাস, সার্বজনীন শিশু যত্ন, এবং ভাড়ানিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটে ভাড়া স্থগিত রাখা। তাঁর পরিকল্পনা অর্থায়ন হবে ধনী ও করপোরেটদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে।
তবে তাঁর পথ সহজ নয়। রাজ্য আইনসভায় সমর্থন গড়ে তোলাই এখন তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ।
তবুও, নির্বাচনী রাতে ব্রুকলিনে তাঁর বিজয় ভাষণ ছিল আশার সুরে ভরা—
“আজ যারা অসম্ভবকে সম্ভব মনে করেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আজ আমরা দেখিয়ে দিলাম, নিউইয়র্ক আর ঘৃণার শহর নয়—এ শহর অভিবাসীদের, এ শহর ভালোবাসার।”
শেষে তিনি বললেন, “নিউইয়র্ক এখন অভিবাসীদের দ্বারা চালিত, আর আজ থেকে অভিবাসীরাই এর নেতৃত্ব দিচ্ছে।”
আর হোয়াইট হাউসের উদ্দেশে তাঁর বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ—
“আমাদের কাছে আসতে চাইলে, তোমাকে আমাদের সকলের মধ্য দিয়েই আসতে হবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।”
















