এক অদ্ভুত সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। তরুণেরা আর নীরব নয়। মরক্কোর রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে নতুন প্রজন্মের স্লোগান—“আমরা হাসপাতাল চাই, স্টেডিয়াম নয়।” মাদাগাস্কারে বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে ক্ষুব্ধ জনগণ যখন সরকার উল্টে দিয়েছে, তখন বোঝা যাচ্ছে, এই তরুণ প্রজন্ম শুধু ক্ষোভ নয়, পরিবর্তনের দাবিও স্পষ্ট করছে।
তাদের প্রতিবাদের কেন্দ্রে এক গভীর আঘাত—অসমতা, ভেঙে পড়া জনসেবা, আর শাসকদের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস। এই তরুণেরা এক নতুন সামাজিক চুক্তির খোঁজে নামছে, যেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকবে নাগরিকের পাশে দাঁড়ানো, নয়তো তারা ভেঙে ফেলবে পুরোনো সেই চুক্তির দেয়াল।
এই সপ্তাহে কাতারে শুরু হচ্ছে ওয়ার্ল্ড সামিট ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট—৩০ বছর পর এমন এক বৈঠক, যেখানে বিশ্বের নেতারা আবারও মুখোমুখি হবেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে। অক্সফামের নির্বাহী পরিচালক অমিতাভ বেহার লিখেছেন, এই সম্মেলন হতে পারে নতুন সূচনা, যদি সরকারগুলো সত্যিই শোনে রাস্তায় নামা তরুণদের কণ্ঠ।
কিন্তু দুঃখের বিষয়—বিশ্ব যেন উল্টো পথে হাঁটছে। অক্সফামের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ৮৪ শতাংশ দেশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ কমিয়েছে। নয়টি দেশের মধ্যে অন্তত একটি ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদতা ঘটেছে। ধনী দেশগুলোর সাহায্য কমে যাওয়ায় গ্লোবাল সাউথ আরও বিপদে পড়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য কমে যাওয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ১ কোটি ৪০ লাখ মৃত্যু ঘটতে পারে।
এমন সময় বিশ্বজুড়ে ধনীরা আগের চেয়ে আরও ধনী হয়ে উঠছে। ১৯৯৫ থেকে আজ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পদ বেড়েছে ৩৪২ ট্রিলিয়ন ডলার—যা সরকারি সম্পদের আটগুণ। অথচ এই বিপুল অর্থে কর প্রায় নেই বললেই চলে। স্পেন ও ব্রাজিলের নেতৃত্বে ধনীদের সম্পদে কর আরোপের দাবিতে যে নড়াচড়া শুরু হয়েছে, তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
আগামী দশ বছরে ধনীরা প্রায় ৭০ ট্রিলিয়ন ডলার হস্তান্তর করবে নিজেদের সন্তানদের হাতে—এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে গেঁথে দেওয়া হবে বৈষম্যের উত্তরাধিকার। অথচ ভালো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এখন কেবল সেই ভাগ্যবানদের জন্য, যাদের কাছে টাকা আছে। কত জলবায়ু বিজ্ঞানী, কত প্রকৌশলী হয়তো জন্ম নিচ্ছে দারিদ্র্যের অন্ধকারে—যাদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগও মিলবে না। ধনী পরিবারের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দরিদ্রদের তুলনায় শতগুণ বেশি, আর দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য সম্ভাবনা আরও কম। এই বঞ্চনা রূপ নিচ্ছে রাগে, প্রতিবাদে, আন্দোলনে।
বিশ্বজুড়ে কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মিতব্যয়িতা ও সংকুচিত রাষ্ট্রনীতির নামে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ ইতিহাস বলে—শক্তিশালী কল্যাণব্যবস্থাই সমাজে আস্থা ও স্থিতি ফিরিয়ে আনে। বিপরীতে, দুর্নীতি ও অব্যবস্থার শাসন মানুষকে ঠেলে দেয় বিক্ষোভে।
জেনারেশন জেডের আন্দোলন প্রমাণ করেছে, তারা আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়। তারা দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করছে। সরকারগুলো যদি তাদের দাবি না শোনে—যদি জনসেবায় বিনিয়োগ না বাড়ায়, যদি বৈষম্য কমাতে পদক্ষেপ না নেয়—তবে আসছে আরও বড় ঝড়। এই তরুণেরা আসলে সেই কয়লাখনির ক্যানারি—যার মৃত্যু জানায়, বাতাসে বিষ জমছে।
তবু সবকিছু শেষ নয়। পৃথিবীর বহু দেশ দেখিয়েছে, অন্য পথও সম্ভব। থাইল্যান্ডের সকল নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কিংবা আফ্রিকার বহু দেশে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা—এগুলোই প্রমাণ, সঠিক ইচ্ছা থাকলে অসম্ভব কিছু নেই।
সরকারগুলোকে এখন বেছে নিতে হবে—তারা কি রাষ্ট্রীয় সম্পদ গড়বে, নাকি কেবল ধনীদের সম্পদ পাহারা দেবে। বেসরকারি অর্থের ভেলকি, হাসপাতাল বেচা, স্কুল বেসরকারিকরণ—এসবই এক ভয়াবহ ভুলপথ। গত এক বছরে স্বাস্থ্যখাতে ৪৯ জন নতুন বিলিয়নিয়ার জন্ম নিয়েছে, অথচ এখনো বিশ্বের অর্ধেক মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।
এই তরুণেরা তাই রাস্তায় নেমেছে হাতে ফুল নয়, দাবি নিয়ে—“আমরা হাসপাতাল চাই, হেলিকপ্টার নয়।” সরকারগুলো যদি তাদের না শোনে, যদি এই আহ্বান উপেক্ষা করে, তবে ইতিহাসই তাদের বিচার করবে।
















