অস্ট্রেলিয়া আগামী ডিসেম্বর থেকে ১৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যাচ্ছে, সেই তালিকায় এবার যুক্ত হলো রেডিট ও লাইভস্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম কিক। এর পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসছে আরও সাতটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, থ্রেডস, টিকটক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইউটিউব।
দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী আনিকা ওয়েলস জানিয়েছেন, ১০ ডিসেম্বর থেকে এই আইন কার্যকর হবে। তিনি বলেন, “অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানায়, সেই একই প্রযুক্তি দিয়ে আমরা চাই তারা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করুক। আমরা চাই শিশুদের শৈশব ফিরে পাক, আর অভিভাবকেরা শান্তি খুঁজে পাক।”
গত বছর নভেম্বর মাসে অনলাইন নিরাপত্তা আইন পাস হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কাছে প্রস্তুতির জন্য সময় ছিল ১২ মাস। শুরুতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক, এক্স ও ইউটিউব। পরে সেই তালিকায় যুক্ত হয় রেডিট ও কিক। ওয়েলস জানিয়েছেন, এই তালিকা ভবিষ্যতেও পরিবর্তিত হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনার জুলি ইনম্যান গ্রান্ট বলেছেন, “শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বিলম্বিত করলে তারা বেড়ে ওঠার জন্য সময় পায়—অ্যালগরিদমের অদৃশ্য ফাঁদ থেকে, অসীম স্ক্রলিংয়ের বিভ্রম থেকে, ক্ষতিকর নকশার ছলনা থেকে মুক্ত হয়ে।”
তিনি আরও জানান, এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে—শিশুরা কি আরও বেশি ঘুমায়, পরিবারে সময় দেয়, বা বাইরে খেলাধুলায় অংশ নেয় কি না—এসব দিক বিবেচনা করে দেখা হবে। “আমরা অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে অন্যরাও যেন শিক্ষা নিতে পারে, সেই লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহ করব,” বলেন গ্রান্ট।
তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই আইন বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, কারণ ব্যবহারকারীদের সরকারকে পরিচয়পত্র দিতে বাধ্য করা যাবে না। তা সত্ত্বেও সরকার জানিয়েছে, নিয়ম না মানলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার (প্রায় ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপ নজর কাড়ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও, যারা শিশুদের মানসিক বিকাশে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।
অন্যদিকে, ফ্রান্সে টিকটকের অ্যালগরিদম তরুণদের আত্মহত্যার ঝুঁকিতে ফেলছে কিনা, সে বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। প্যারিসের প্রসিকিউটর লর বেকুও জানিয়েছেন, টিকটকের অপর্যাপ্ত তদারকি ও সহজলভ্যতা তরুণদের বিপজ্জনক কনটেন্টের চক্রে টেনে নিচ্ছে। তদন্তে আত্মহত্যা-উৎসাহিত প্রচারণা এবং অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।
বিশ্বজুড়ে ১৫০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী নিয়ে টিকটক ইতোমধ্যে নানা বিতর্কের মুখে পড়েছে—কখনও কিশোর আত্মহত্যা ও শারীরিক অনিরাপত্তার অভিযোগে, কখনও বিদেশি রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কায়।
অস্ট্রেলিয়া এখন এক ভিন্ন পথে হাঁটছে—যেখানে প্রযুক্তির ঝলমলে জগৎ থেকে শিশুদের একটু দূরে রেখে তাদের জীবনের প্রকৃত আলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। পর্দার নীল আলো নয়, বরং রোদে খেলার, বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাওয়ার, কিংবা একটুখানি নীরবতার সময়টুকু ফেরত দিতে চায় এই সিদ্ধান্ত।
















