মরক্কোর রাজধানী রাবাতে পৌঁছেও নিরাপত্তা বা স্থিতি পাচ্ছেন না সুদান থেকে পালিয়ে আসা বহু শরণার্থী। যুদ্ধ, নির্যাতন ও দীর্ঘ বিপজ্জনক যাত্রার পর তারা এখন আটকে পড়েছেন সীমান্ত, আইনগত জটিলতা এবং অনিশ্চয়তার এক কঠিন বাস্তবতায়।
১৭ বছর বয়সী আমির আলির গল্প যেন এই সংকটের প্রতিচ্ছবি। সুদানের দারফুর অঞ্চলে যুদ্ধের সময় পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। পথে তাকে আটক, নির্যাতন, চাঁদাবাজি এমনকি মানবপাচারের শিকার হতে হয়েছে। লিবিয়ায় বন্দিদশা ও নির্যাতনের পর তিনি আলজেরিয়া হয়ে মরক্কোর সীমান্তে পৌঁছান।
কিন্তু সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করতে গিয়ে তাকে নিরাপত্তা বাহিনী আটক করে, মারধর করে এবং কয়েকদিন আটক রেখে মরুভূমির দিকে ফেরত পাঠানো হয়। এরপরও তিনি আবার চেষ্টা করেন এবং অবশেষে মরক্কোতে প্রবেশ করতে সক্ষম হন।
২০২৩ সালে সুদানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী মরক্কোর দিকে আসছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে নিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজারের বেশি, যার মধ্যে সুদানিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
তবে মরক্কো শরণার্থী সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ আশ্রয় আইন কার্যকর হয়নি। ফলে বাস্তবে শরণার্থীদের নিবন্ধন ও সুরক্ষার দায়িত্ব অনেকাংশে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ওপর নির্ভর করছে।
শরণার্থীরা সীমিত সহায়তা পাচ্ছেন। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র নেই, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত এবং কাজের সুযোগও খুব কম। নিবন্ধিত শরণার্থীদের মধ্যে অতি সামান্য সংখ্যকই আনুষ্ঠানিক চাকরি পেয়েছেন।
রাবাতের একটি সহায়তা কেন্দ্রে কাজ করা এক মনোবিজ্ঞানী জানান, অনেক শরণার্থী গুরুতর শারীরিক ও মানসিক আঘাত নিয়ে আসেন। কেউ কেউ নির্যাতন, ধর্ষণ ও দাসত্বের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন।
আইনগত সুরক্ষা থাকলেও বাস্তবে তা সবসময় কার্যকর হয় না। অনেক শরণার্থী অভিযোগ করেছেন, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও তাদের শহর থেকে তুলে নিয়ে সীমান্ত এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় শরণার্থীদের জন্য সহায়তা কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন আগতদের নিবন্ধন, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা পেতে দেরি হচ্ছে।
আমির আলি এখন রাবাতে অবস্থান করছেন। তিনি শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হলেও নিজেকে নিরাপদ মনে করেন না। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে না।
ইউরোপে যাওয়ার পথ তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। পুনর্বাসনের সুযোগও খুব সীমিত। তাই আপাতত অপেক্ষা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না তিনি।
তার কথায়, জীবন এখন এক দীর্ঘ অপেক্ষা—যেখানে প্রতিদিনই অনিশ্চয়তা, ভয় আর বেঁচে থাকার লড়াই একসঙ্গে চলতে থাকে।
















