বিশ্বজুড়ে অনলাইন প্রতারণা দিন দিন আরও জটিল ও সংগঠিত হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের বিস্তারের ফলে প্রতারক চক্রগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। একই সঙ্গে এই প্রতারণা ঠেকাতে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও যৌথভাবে উদ্যোগ বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের নর্থ ইয়র্কশায়ারের এক নারী, চল্লিশোর্ধ্ব কির্স্টি, একটি পরিচয়ভিত্তিক ওয়েবসাইটে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হন। নিজেকে তুরস্কে কর্মরত ব্রিটিশ ব্যবসায়ী দাবি করা ওই ব্যক্তি নানা কৌশলে তার আস্থা অর্জন করে। কিছুদিন পর নিজেকে বিপদে পড়েছে বলে দাবি করে তার কাছ থেকে অর্থ সহায়তা চায়। ধাপে ধাপে প্রায় ৮০ হাজার পাউন্ড তিনি প্রতারকের কাছে পাঠান, যার একটি বড় অংশ ছিল পরিবারের কাছ থেকে ধার করা।
পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি আসলে বিদেশি প্রতারক চক্রের সদস্য এবং তার দেখানো সব তথ্যই ছিল ভুয়া। টাকা বিভিন্ন দেশের নামে পরিচালিত অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় এবং যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত পরিচয়ও ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহামারির সময় মানুষ বেশি সময় অনলাইনে কাটাতে শুরু করায় প্রতারণার সুযোগ বেড়ে যায়। সেই সময় থেকেই এই অপরাধ দ্রুত বাড়তে থাকে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতারণার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতারণার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর আন্তর্জাতিক চরিত্র। অনেক ক্ষেত্রে এক দেশে বসে প্রতারক অন্য দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তৃতীয় দেশের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন সম্পন্ন করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এই জটিল নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে প্রতারণা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, যেখানে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের জোরপূর্বক এই কাজে লাগানো হয়। চাকরির প্রলোভনে বিদেশে নিয়ে গিয়ে তাদের পাসপোর্ট জব্দ করে প্রতারণায় বাধ্য করা হয়। নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতনও চালানো হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একাধিক দেশ প্রতারণা প্রতিরোধে সহযোগিতা বাড়াতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। তবে অনেক উন্নয়নশীল দেশ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতার অভাবে এই লড়াইয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যা সমাধানে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, তথ্য আদান-প্রদান এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্তকরণ, ক্ষতিকর অ্যাপ প্রতিরোধ এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়াতে ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সব উদ্যোগের মাঝেও ভুক্তভোগীদের ক্ষতি সহজে পুষিয়ে নেওয়া যায় না। অর্থ হারানোর পাশাপাশি অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। তাই দ্রুত ও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
















