সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের কুয়াশা আর নতুন সংস্কৃতির টানে আজকের তরুণেরা পাড়ি দিচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ব্যাগে টাকা নয়, সঙ্গে আছে স্বপ্ন—আর বিনিময়ে কিছু ঘণ্টার পরিশ্রম। কেউ হোস্টেলে কাজ করছে, কেউ খামারে, কেউবা শিশুদের পড়াচ্ছে—বিনা খরচে থাকার সুযোগের বিনিময়ে।
স্পেনের তরুণ ভ্রমণপ্রেমী নাইয়ারা সাইয বিলবাওও এমন এক স্বপ্নে ভেসে উঠেছিলেন। একদিন সামাজিক মাধ্যমে স্ক্রল করতে করতে তিনি খুঁজে পেলেন স্বেচ্ছাসেবী কাজের এক প্রস্তাব—কোস্টা রিকার এক সমুদ্রপাড়ের হোস্টেলে কাজের সুযোগ। শর্ত সহজ—প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজ করলেই ফ্রি থাকা আর প্রকৃতির মাঝে স্বপ্নময় দিন। তিনি ভাবলেন, “এ যেন স্বর্গ!”
কিন্তু সেই স্বপ্ন গড়িয়ে পড়ল ভাঙা কাঁচের মতো। গন্তব্যে পৌঁছে তিনি দেখলেন, হোস্টেল নয়—একটি অন্ধকার, জানালাহীন নির্মাণাধীন ভবন, যেন এক বন্দিশালা। পরদিনই শুরু হলো বাস্তবের কঠিন পরীক্ষা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, তাঁকে দেওয়া হলো টয়লেট পরিষ্কারের ঝাড়ু। প্রথমে সামান্য কাজ, পরে প্রতিদিন আট ঘণ্টা শ্রম।
হাত জ্বালিয়ে দিচ্ছিল ব্লিচ, সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আর একদিন সকালে তিনি দেখলেন, ব্যাগের ভেতরে লুকানো চারশ ডলার উধাও। অভিযোগ করলে হোস্টেল ব্যবস্থাপক তাঁকে পঞ্চাশ ডলার দিতে চাইলেন, শর্ত—তিনি যেন নেতিবাচক রিভিউ না দেন। নাইয়ারা তা প্রত্যাখ্যান করলেন।
তবু তাঁর অভিজ্ঞতা অনন্য নয়। আজকের বিশ্বে এমন হাজারো তরুণ–তরুণী আছেন যারা “ভলান্টিয়ার ট্রাভেল” নামের স্বপ্নে ভেসে চলেছেন—অল্প টাকায় বিশ্ব দেখা, কাজের বিনিময়ে থাকা।
এই ধারণার শিকড় বহু পুরনো। ‘হেল্পস্টে’ প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা শে গ্লিসন বলেন, “এ তো মূলত বিনিময়—আশ্রয়ের বদলে সাহায্য।” ইন্টারনেট যুগে এই বিনিময় পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক আন্দোলনে।
‘ওয়ার্ল্ডপ্যাকার্স’-এর দাবি, তাদের সদস্য সংখ্যা সাত মিলিয়নের বেশি। ‘ওয়ার্কঅ্যাওয়ে’ ও ‘ডব্লিউডব্লিউওওএফ’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোও বিশ্বজুড়ে লাখো তরুণকে আকৃষ্ট করছে। কেউ খামারে কাজ করছে, কেউ সার্ফ স্কুলে প্রশিক্ষক, কেউবা স্থানীয় পরিবারে শিশু যত্ন নিচ্ছে।
দক্ষিণ ডাকোটার জেনা পোলার্ডও ছিলেন এমন এক ভ্রমণকারিণী। থাইল্যান্ডের পাহাড়ি এক চিনাবাদাম খামারে দশ দিন কাজ করে তিনি শিখেছিলেন ভাষা, বন্ধুত্ব আর জীবনের নতুন অর্থ। এখন তিনি বলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাসটা আবার ফিরে আসে—মনে হয়, আমরা একে অপরের জন্যই বেঁচে আছি।”
কিন্তু নাইয়ারার অভিজ্ঞতা ছিল উল্টো। স্বপ্নের হোস্টেল হয়ে উঠল দুঃস্বপ্নের জায়গা। তিনি বুঝলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার চকচকে ভিডিওর আড়ালে লুকিয়ে থাকে অজানা বিপদ।
তবু প্ল্যাটফর্মগুলো দাবি করে, তারা নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। কেউ প্রতিটি হোস্টকে যাচাই করে, কেউ সদস্যদের পরিচয়পত্র ও থাকার জায়গার ছবি নেয়। তবু তারা একই সঙ্গে বলে—তারা কেবল সংযোগ ঘটায়, দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবক ও আয়োজকের নিজের।
“ভ্রমণ কখনোই ঝুঁকিমুক্ত নয়,” বলেন গ্লিসন। “আমরা বড়দের ভ্রমণ নিয়ে কাজ করি, শিশুদের নয়।”
ওয়ার্ল্ডপ্যাকার্সের প্রধান নির্বাহী রিকার্ডো লিমা বলেন, “আমি বরং ভয় পাই তাদের জন্য, যারা ভ্রমণ না করে জীবনের অভিজ্ঞতা হারিয়ে ফেলে।”
তবে নাইয়ারা মনে করেন, সামাজিক মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতাগুলোকে এতটাই রোমান্টিক করে দেখানো হয় যে অনেক তরুণ ঝুঁকির দিকটি ভুলে যায়। বিশেষ করে নারী ভ্রমণকারীরা, যারা ভাবেন যে এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত। অথচ বিপদ যখন আসে, তখন তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
একটি নতুন হোস্টেল থেকে জুমে কথা বলতে বলতে নাইয়ারা বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য কাউকে নিরুৎসাহিত করা নয়। বরং তিনি চান সবাই সাবধান থাকুক, জানুক কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে কাজ করছে।
তিনি নরম কণ্ঠে বলেন, “না যাও, এটা আমি বলব না। শুধু বলব—যাও, কিন্তু প্রস্তুত থেকো।”
















