দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখেছেন মহাকাশে সৌরশক্তি সংগ্রহ করে তা পৃথিবীতে পাঠানোর। একসময় যা ছিল কল্পবিজ্ঞানের অংশ, সেটি এখন বাস্তবের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ এখন বিনিয়োগ করছে মহাকাশভিত্তিক সৌরশক্তি প্রকল্পে।
গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় জ্যাকসনভিল জাগুয়ার্স ফুটবল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এক ব্যতিক্রমী পরীক্ষায় সূর্যের আলোকে লেন্সের মাধ্যমে সংগ্রহ করে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাঠানো হয়। এই পরীক্ষা পরিচালনা করে ফ্লোরিডাভিত্তিক কোম্পানি স্টার ক্যাচার। তাদের লক্ষ্য ছিল সূর্যালোককে মহাকাশে প্রেরণ করে স্যাটেলাইটে শক্তি সরবরাহের সম্ভাবনা যাচাই করা।
স্টার ক্যাচার কোম্পানি ১০৫ মিটার দূরত্বে প্রায় ১০০ ওয়াট শক্তি সফলভাবে পাঠাতে সক্ষম হয়। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু রাশ বলেন, “আমরা সূর্যালোককে কেন্দ্রীভূত করে প্রেরণ করেছি, যেন মহাকাশে স্যাটেলাইটে শক্তি পাঠানো সম্ভব কি না তা দেখা যায়।”
এই ধারণার মূল লক্ষ্য হলো মহাকাশে থাকা বিশাল সৌর প্যানেলগুলোর মাধ্যমে সূর্যালোক সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠানো। পৃথিবীর আবহাওয়া, দিন-রাতের পার্থক্য এবং মেঘের কারণে সৌর প্যানেলের কার্যক্ষমতা সীমিত থাকে। কিন্তু মহাকাশে এসব বাধা নেই, ফলে সেখান থেকে সূর্যালোক প্রায় সার্বক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করা যায়।
যুক্তরাজ্যের স্পেস সোলার কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড হমফ্রে বলেন, “মহাকাশভিত্তিক সৌর শক্তিই হতে পারে জ্বালানি পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি।” তিনি দাবি করেন, এই প্রযুক্তি ইউরোপের প্রায় ৮০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তির চাহিদা পূরণ করতে পারে।
তবে বাস্তবে এটি রূপ দিতে হলে মহাকাশে বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যা পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল। তাছাড়া, পৃথিবীতে বিদ্যমান নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস যেমন সৌর ও বায়ুশক্তি, তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং সহজলভ্য।
তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে মহাকাশভিত্তিক সৌরশক্তির সুফল বিপুল হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে এই প্রযুক্তিতে আগ্রহ দেখিয়েছে, কারণ এটি যুদ্ধক্ষেত্র বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর যেকোনো স্থানে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করতে পারবে।
এই প্রযুক্তির কার্যপ্রণালি তুলনামূলক সহজ: মহাকাশে সৌর প্যানেল সূর্যালোককে বিদ্যুতে রূপান্তর করবে, পরে তা মাইক্রোওয়েভ বা লেজারের মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠানো হবে। স্থলভাগে থাকা বিশাল অ্যান্টেনা সেই শক্তি সংগ্রহ করে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুতে রূপান্তর করবে।
চীন ইতিমধ্যেই ওমেগা ২.০ নামের একটি প্রোটোটাইপ স্যাটেলাইট তৈরি করেছে, যা মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির মাধ্যমে ৫৫ মিটার দূরত্বে ২,০৮১ ওয়াট শক্তি পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ইএসএ-ও “সোলারিস” নামে একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার কোম্পানি এইথারফ্লাক্সও কাজ করছে শক্তিশালী ইনফ্রারেড লেজারের মাধ্যমে মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে শক্তি পাঠানোর পরিকল্পনায়। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, লেজার বিম যদি কোনো বিমান বা বস্তু অতিক্রম করে, সেটি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে নিরাপত্তার জন্য।
যুক্তরাজ্যের স্পেস সোলার কোম্পানি আরও বৃহৎ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে — তারা “ক্যাসিওপিয়া” নামে এক বিশাল মহাকাশ বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে চায়, যা পৃথিবীর উপরে ৩৬,০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থান করবে। এটি একাই প্রায় পাঁচ লাখ ঘরের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে পারবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
মার্কিন কোম্পানি ভার্টাস সোলিস আবার ২০০,০০০ স্যাটেলাইট নিয়ে এক বিশাল সৌর নেটওয়ার্ক গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ২০২৭ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে। তাদের দাবি, এই প্রযুক্তি একসময় পৃথিবীর বিদ্যুৎ খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, মহাকাশে এত বিপুল সংখ্যক স্যাটেলাইট পাঠানো কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা লেটিজিয়া বলেন, “একটি ছোট দুর্ঘটনাও এই শিল্পের ভবিষ্যৎকে বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
তবুও আশাবাদী অনেকে মনে করেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে মহাকাশভিত্তিক সৌরশক্তি একদিন বাস্তবে রূপ নেবে। এই প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের মতোই বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার প্রতীক হতে পারে।
স্টার ক্যাচার এখন তাদের পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এবার নাসার কেপ ক্যানাভেরালের রানওয়েতে, যেখানে তারা একাধিক কিলোমিটার দূরে শক্তি প্রেরণের রেকর্ড স্থাপন করতে চায়।
















