পূর্ব ইউক্রেনের মাটিতে আগুন ছড়াচ্ছে যুদ্ধের ঝড়। পোকরোভস্ক ও মিরনোগ্রাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে রক্তক্ষয়ী লড়াই, যেখানে রাশিয়া চাইছে দোনেৎস্কের অবশিষ্ট অংশ পুরোপুরি দখলে নিতে।
রবিবার রুশ সেনাবাহিনীর প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জানান, তাদের দ্বিতীয় ও ৫১তম বাহিনী ‘দুই দিক থেকে শত্রুকে ঘিরে ফেলেছে’। দাবি, প্রায় ৫,৫০০ ইউক্রেনীয় সেনা—যাদের মধ্যে আছেন প্যারাট্রুপার ও মেরিন ইউনিট—ঘেরাও হয়ে পড়েছে।
কিন্তু রুশ যুদ্ধ-সাংবাদিকরাই সেই দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। এক জনপ্রিয় টেলিগ্রাম প্রতিবেদক লিখেছেন, “কোনো ঘেরাও নেই, দুই বাহিনীর দূরত্ব এখনো কয়েক কিলোমিটার।”
ইউক্রেনীয় সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কিইও জানান, “রাশিয়ার প্রচারণা পুরোপুরি মিথ্যা। পোকরোভস্ক কিংবা কুপিয়ানস্কে আমাদের বাহিনী ঘেরাও হয়নি।”
বর্তমানে পোকরোভস্কে যুদ্ধ হচ্ছে ছোট ছোট পদাতিক ইউনিটের মধ্যে, যাদের আকাশের মাথায় ঘুরছে অসংখ্য ড্রোন। একদা বাড়ি-ঘরভিত্তিক যুদ্ধের জায়গা নিয়েছে প্রযুক্তি ও নিঃশব্দ মরণখেলা।
জিওলোকেটেড ফুটেজে দেখা যায়, কিছু রুশ দল শহরের পশ্চিমাংশে প্রবেশ করেছে, কিন্তু পুরো দখল নিতে পারেনি। ইউক্রেনের সেনাবাহিনী জানায়, প্রায় ২০০ রুশ সেনা ঢুকলেও তারা বারবার প্রতিহত হচ্ছে—সাবোটাজ অপারেশন চলছে পুরোদমে।
পোকরোভস্ক ঘিরে পরিস্থিতি রুদ্ধশ্বাস। ইউক্রেনীয় বিশ্লেষক কনস্ত্যানতিন মাশোভেৎস বলেন, রুশ বাহিনী ৬ থেকে ১০ হাজার সৈন্য এনে নতুন আক্রমণ চালাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, “দখলদারদের মূল লক্ষ্য পোকরোভস্ক। এখানেই তারা তাদের সবচেয়ে বড় বাহিনী নামিয়েছে।”
এদিকে, ইউক্রেনের প্রতিশোধ এখন পৌঁছে গেছে রাশিয়ার ভেতর। দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে তারা হামলা চালাচ্ছে রুশ তেল শোধনাগারে। রিয়াজান রিফাইনারি পুড়ে যায় ২৩ অক্টোবর, যখন রাশিয়া দাবি করে, এক রাতেই তারা ১৩৯টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
সেই উত্তেজনার মাঝেই পুতিনের নতুন নাটক—নিউক্লিয়ার শক্তির গর্ব। যুদ্ধে আহত রুশ প্রবীণদের সঙ্গে এক চা-আড্ডায় তিনি ঘোষণা দেন, “আমরা সফলভাবে পরীক্ষা করেছি পারমাণবিক চালিত টর্পেডো ‘পোসাইডন’—যা তৈরি করতে পারে তেজস্ক্রিয় জলোচ্ছ্বাস।”
পুতিনের দাবি, এই অস্ত্রের কোনো সমকক্ষ পৃথিবীতে নেই। তার কথায়, “এটি পুরো একটি রাষ্ট্র অচল করে দিতে সক্ষম।” কয়েকদিন আগেই তিনি আরেক পারমাণবিকচালিত ক্ষেপণাস্ত্র ‘বুরেভেস্তনিক’-এর পরীক্ষার কথাও জানান।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাশিয়ার এই ঘোষণা শুধু সামরিক প্রদর্শন নয়—এটি এক রাজনৈতিক ভয় প্রদর্শন। ২০২৪ সালের নভেম্বরেও মস্কো এমনই এক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছিল ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে। এবারও একই দৃশ্য—বিশ্বকে দেখানো যে রাশিয়া এখনো ভয়ঙ্কর।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও এই প্রদর্শনে অসন্তুষ্ট। তার মন্তব্য, “যুদ্ধের চেয়ে শান্তির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত পুতিনের। যে যুদ্ধ এক সপ্তাহে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা এখন চতুর্থ বছরে।”
রক্ত, ধোঁয়া আর রাজনীতির এই অনিশ্চিত কুয়াশায় ইউক্রেনের আকাশ এখনো জ্বলছে—আর পৃথিবী তাকিয়ে আছে, শেষ কোথায় এই আগুনের সীমানা।
















