যে বছর পৃথিবী থমকে গিয়েছিল—২০২০। নিঃশব্দে থেমে গিয়েছিল কারখানার শব্দ, দোকানগুলোর দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আকাশে বিশাল উড়োজাহাজের বহর নিস্তব্ধ রানওয়েতে জমে ছিল ধুলোর স্তরে। আর সেই সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সমুদ্রের রাজপুত্রেরা—ক্রুজ জাহাজগুলো।
মারণ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে যখন বিশ্বের প্রায় সব দেশই নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছিল, তখন ক্রুজ শিল্পও থেমে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু থেমে যাওয়া মানেই শেষ নয়—কিছুদিনের মধ্যেই দেখা দিলো বেঁচে থাকার লড়াই। রক্ষার উপায়? পুরোনো জাহাজগুলোকে পাঠিয়ে দেওয়া স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে—মৃত্যুর পথে।
চট্টগ্রামের মতো দক্ষিণ বিশ্বের কয়েকটি জায়গায় যেমন বড় জাহাজ ভাঙার কাজ হয়, তেমনি ভূমধ্যসাগরের নীল তীরে, তুরস্কের ইজমিরের কাছে আলিয়াগা বন্দরে রয়েছে পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম জাহাজ ভাঙার কেন্দ্র। আর সেখানেই করোনার মারণ ঢেউয়ে ডুবে যাওয়া বহু ক্রুজ জাহাজ খুঁজে পেয়েছিল তাদের শেষ আশ্রয়।
তুর্কি আলোকচিত্রী উমিত বেকতাস তখন শুনেছিলেন, এই বিশাল জাহাজগুলো একে একে আসছে আলিয়াগায়। তিনি জানতেন, তাদের শেষযাত্রার এই মুহূর্তগুলোই বলে দেবে এক মহামারির নিষ্ঠুর অর্থনীতি। “মানুষের কষ্টের অনেক ছবি আমরা তুলেছি,” বলেছিলেন তিনি। “কিন্তু এই জাহাজগুলোই প্রমাণ করে, কীভাবে এক রোগ পুরো ব্যবসায়িক জগতকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।”
২০২০ সালের শুরুতে, ‘ডায়মন্ড প্রিন্সেস’-এর মতো বিলাসবহুল জাহাজগুলোতেই প্রথম ধরা পড়েছিল ভাইরাসের ছায়া। শত শত যাত্রী আক্রান্ত, বহু মৃত্যু—এর পর থেকেই একের পর এক ক্রুজ কোম্পানি বন্ধ হতে থাকে। কয়েক মাসের মধ্যেই চল্লিশের বেশি জাহাজে সংক্রমণ ধরা পড়ে, প্রায় চল্লিশ হাজার নাবিক আটকা পড়ে সাগরে, বিচ্ছিন্ন ও অনিশ্চিত জীবনে।
একটি জাহাজ নোঙর করে রাখলেও, তা চালু রাখার খরচ আকাশছোঁয়া। তাই অনেক কোম্পানির জন্য একমাত্র উপায় ছিল পুরোনো জাহাজ বিক্রি করে ফেলা—মৃত্যুর সাগরে তাদের ভাসিয়ে দেওয়া।
আলিয়াগার নাম তুরস্কে আগেই ছিল পরিচিত—বিপজ্জনক কর্মপরিবেশ ও দূষণের কারণে। “কাজটা খুব কঠিন,” বলেন বেকতাস। “কিন্তু এই ছবিগুলো তুলে ধরতে হতো, কারণ এগুলোই দেখায় মহামারির বাস্তব রূপ।”
অনুমতি না পেয়ে তিনি পাহাড়ের উপর থেকে উড়িয়েছিলেন একটি ড্রোন। আধঘণ্টার সেই আকাশযাত্রায় তিনি বন্দী করেছিলেন নিস্তব্ধ, রঙিন দৈত্যদের সারি—জাহাজগুলো অপেক্ষা করছে কেটে ফেলা, গলিয়ে দেওয়ার জন্য। “সেই ছবি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল,” বলেন তিনি। “এক অদ্ভুত সৌন্দর্য ছিল সেই দৃশ্যে—একই সঙ্গে মৃত্যু আর নান্দনিকতা।”
“এটা দুঃখের ছবি,” বলেন বেকতাস। “দুঃখের তাদের জন্য যারা এই জাহাজগুলোর মালিক, আর তাদের জন্যও যারা একদিন এই ডেকে হেঁটে হেসেছিল।”
মহামারির পর যখন প্রথম কোনো ক্রুজ জাহাজ আবার ইজমিরের কাছে কুশাদাসি বন্দরে পৌঁছেছিল, সেটিও যেন ছিল এক নতুন সূর্যোদয়—একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাসের পর পৃথিবীর ফেরা জীবনের টানে।
আজও আলিয়াগার সেই ইয়ার্ডে পুরোনো কার্গো জাহাজ ভাঙা চলছেই। কিন্তু ২০২0 সালের সেই দৃশ্যগুলো, সমুদ্রের নীল পটে সারি সারি মৃত জাহাজের সেই চিত্র—রয়ে গেছে ইতিহাসের এক নিঃশব্দ কবিতার মতো, যেখানে ধ্বংসই হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার শেষ ভাষা।
















