রতন টাটার প্রয়াণের এক বছর পেরোতেই টাটা গ্রুপ যেন হারিয়েছে নিজের ভারসাম্য। একসময়কার এই লবণ থেকে ইস্পাত—সবজায়গায় বিস্তৃত সাম্রাজ্য, যেটি রতনের হাতে পেয়েছিল আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নতুন পরিচয়, আজ গভীর অস্থিরতায় নিমজ্জিত।
নটরাজন চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্বে টাটা গ্রুপ এখন একাধিক ঝড়ের মুখে। বোর্ডরুমের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দ্বন্দ্ব আবারও ফেটে পড়েছে। দাতব্য সংস্থা টাটা ট্রাস্টসের ট্রাস্টিদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেন্দ্রীয় সরকারকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে—যেন ২০১৬ সালের সেই ভয়াবহ সঙ্কটের পুনরাবৃত্তি না হয়, যখন সাইরাস মিস্ত্রিকে চেয়ারের বাইরে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল।
কয়েক সপ্তাহ আগেও দিল্লি সরকারের মধ্যস্থতায় এক অস্থায়ী সমঝোতা হয় বলে খবর ছড়িয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রতন টাটার ঘনিষ্ঠ মেহলি মিস্ত্রিকে টাটা ট্রাস্টসের বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে—যদিও এ তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
মারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিরচিয়া রাইয়ানু, যিনি টাটা কর্পোরেশনের ইতিহাস নিয়ে বই লিখেছেন, বলেন—“এটি এক অনিরসনকৃত পুরনো যুদ্ধের পুনর্জাগরণ।” তার ভাষায়, “কে আসলে টাটা সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রক? এবং কতটা কর্তৃত্ব থাকা উচিত টাটা ট্রাস্টসের হাতে, যাদের কাছে টাটা সন্সের ৬৬ শতাংশ শেয়ার?”
টাটার কাঠামো নিজেই এক জটিল ধাঁধা। তাদের মূল কোম্পানি টাটা সন্স—একটি বাণিজ্যিক হোল্ডিং কোম্পানি—এর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে দাতব্য সংস্থা টাটা ট্রাস্টসের হাতে। ফলে একদিকে কর সুবিধা ও সামাজিক কাজের পরিসর বেড়েছে, অন্যদিকে দ্বৈত লক্ষ্য—লাভ আর দান—দু’য়ের টানাপোড়েনে শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ঠিক এই সময়ে, যখন টাটা নতুন করে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রিক গাড়ি এবং ধুঁকতে থাকা এয়ার ইন্ডিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায় ব্যস্ত, তখনই এই অন্তর্দ্বন্দ্ব তাদের আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে।
সূত্র বলছে, বোর্ডে সদস্য নিয়োগ, তহবিল অনুমোদন এবং টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে ট্রাস্টিদের মধ্যে মতভেদ চরমে উঠেছে। কেউ কেউ চান, ট্রাস্টস আরও সরাসরি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখুক—শুধু তত্ত্বাবধায়ক নয়, কার্যকর কর্তৃত্বের অধিকারী হোক।
অন্যদিকে, সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডার এসপি গ্রুপ, যাদের হাতে ১৮ শতাংশ শেয়ার, দীর্ঘদিন ধরে চাইছে টাটা সন্সকে পাবলিক করা হোক। কিন্তু অধিকাংশ ট্রাস্টি ভয় পাচ্ছেন—“বাজারে তালিকাভুক্ত হলে টাটার দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টি দুর্বল হয়ে পড়বে, ত্রৈমাসিক মুনাফার চাপে সিদ্ধান্তের স্থায়িত্ব হারাবে।”
এসপি গ্রুপের দাবি, এটি “নৈতিক ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা”—যা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে।
অধ্যাপক রাইয়ানু মনে করেন, “বিদেশে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখন টাটা ট্রাস্টসকেই অনুকরণ করছে—মজবুত ভিত্তি গড়তে ‘ফাউন্ডেশন মালিকানা’ মডেল বেছে নিচ্ছে। কিন্তু এই বদ্ধ কাঠামো বাইরের নজরদারি কমিয়ে দেয়, যা সংঘাত ও সুনামের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়।”
এদিকে, টাটার ভাবমূর্তি তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রচারক দিলিপ চেরিয়ান, যিনি একসময় সাইরাস মিস্ত্রির সঙ্গে কাজ করেছেন, বলেন—“এয়ার ইন্ডিয়ার দুর্ঘটনা, জেএলআরের সাইবার হামলা, আর এখন এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে টাটার গৌরবময় ইমেজে কালো দাগ পড়েছে।”
জেএলআরের কারখানাগুলো সেপ্টেম্বরে পাঁচ সপ্তাহ বন্ধ ছিল, যুক্তরাজ্যের গাড়ি উৎপাদন নেমেছে ৭০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে। একই সময়, টিসিএস—যেটি টাটা গ্রুপের আয়ের অর্ধেক জোগায়—ভুগছে ছাঁটাই আর হারানো চুক্তির সমস্যায়।
“বিনিয়োগকারীদের এখন প্রশ্ন—টাটার ভেতরে আসলে কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?”—বললেন চেরিয়ান।
এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেও টাটা সন্সের চেয়ারম্যান নটরাজন চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। একজন ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়—“বোর্ডে বিভাজন নয়, ট্রাস্টিদের দ্বন্দ্বই সমস্যা। তবে এই বিভ্রান্তি তাকে অপ্রয়োজনে ভারাক্রান্ত করছে।”
টাটা ইতিহাসে সংকট নতুন নয়। রতন টাটার আধুনিকীকরণ অভিযান থেকে শুরু করে সাইরাস মিস্ত্রি অধ্যায়—প্রতিটি পর্বেই টাটা গ্রুপ যেন আগুনে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এইবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
অধ্যাপক রাইয়ানুর মতে, “একসময় টিসিএস ছিল গ্রুপের আর্থিক নোঙর। তার আগে এই ভূমিকা পালন করেছিল টাটা স্টিল। এখন, টিসিএসের নিজস্ব মডেলই যখন চাপের মুখে, তখন নতুন কোনো নোঙর এখনও দেখা যায়নি।”
তিনি সতর্ক করেন—“এই ঝড় স্বল্পমেয়াদে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, কিন্তু হয়তো এর ভেতর থেকেই উঠে আসবে এক নতুন টাটা—আরও স্বচ্ছ, আরও দায়বদ্ধ, আর হয়তো রতন টাটার স্বপ্নের চেয়েও দৃঢ়।”
















