শরৎ মানেই প্রকৃতির রঙিন এক উৎসব। লাল, হলুদ, কমলা—পাতার এ রঙ বদলের নেশায় মানুষ ছুটে যায় পাহাড়ে, বনে, নদীর তীরে। এ দৃশ্যের মোহে মুগ্ধ হয়ে গেছেন হেনরি ডেভিড থরো ও এমিলি ডিকিনসনের মতো কবিরাও। শতাব্দী পেরিয়ে আজও সেই ঐতিহ্য চলছে—মানুষ বেরিয়ে পড়ে শরতের সৌন্দর্য দেখতে। কেউ গাড়ি নিয়ে ছুটে চলে ভেরমন্টের পাহাড়ে, কেউ আবার নিউইয়র্কের অ্যাডিরনড্যাকস বা টেক্সাসের প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায় রঙিন গাছেদের ছায়ায়। তবে শুধু আমেরিকায় নয়, পৃথিবীর নানা প্রান্তেও শরতের রঙের এমন অপূর্ব মেলা বসে—যেখানে প্রকৃতি রঙ তুলিতে আঁকে এক মহাকাব্যিক দৃশ্য।
নিচে এমন চারটি দেশের গল্প, যেখানে শরৎ একেবারেই জীবন্ত হয়ে ওঠে রঙে, আলোয় আর নিস্তব্ধ সৌন্দর্যে।
ক্যুবেক, কানাডা
নিউ ইংল্যান্ডের মতোই ক্যুবেকেও শরতের সময় চিনি-গাছের পাতাগুলো জ্বলে ওঠে লাল, কমলা আর সোনালি রঙে। প্রদেশটির লরেনশিয়ান পাহাড় থেকে শুরু করে ইস্টার্ন টাউনশিপ পর্যন্ত বিস্তৃত এই রঙিন সৌন্দর্য তুলনাহীন। বোঞ্জুর ক্যুবেকের প্রতিনিধি জোসি লাপকে বলেন, “নিউ ইংল্যান্ডের ভিড় ছাড়া শরতের রঙ উপভোগের জন্য ক্যুবেক এক অনন্য গন্তব্য।” মাউন্ট সাটনের পার্ক দ’অঁভিরনমঁ ন্যাচুরেল দ্য সাটনে উঠতে পারেন চেয়ারলিফটে, কিংবা আরও রোমাঞ্চ চাইলে জিপলাইনে ভেসে যেতে পারেন রঙিন গাছের মগডালে। আর শহুরে আবেশে শরতের স্বাদ নিতে চাইলে কুইবেক সিটির কাছের জ্যাক-কার্টিয়ার ন্যাশনাল পার্ক আপনাকে দেবে উভয়েরই মিশেল।
জাপান
জাপানে শরতের পাতার রঙ বদল এক জাতীয় উৎসবের মতো—যার নাম মোমিজিগারি, অর্থাৎ “লাল পাতার খোঁজে যাত্রা”। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত চলে এই সময়। টোকিওর কাছের ইয়োরো উপত্যকা, ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের তেনরিউ-জি মন্দিরের চারপাশের দৃশ্য কিংবা হোক্কাইদোর ডাইসেতসুজান জাতীয় উদ্যান—সবখানেই শরতের এক রূপকথা। নভেম্বর মাসকে ধরা হয় পাতার রঙ দেখার সেরা সময় হিসেবে, তবে পাহাড়ের উচ্চতার ওপর তা বদলাতে পারে।
এই সময়টাতেই জাপানের আরেক প্রাচীন রীতি শিনরিন-ইয়োকু বা “বনের স্নান”—যেখানে মানুষ মনোযোগ দিয়ে প্রকৃতির পথে হাঁটে, নিঃশব্দে শোনে পাতার ঝরা শব্দ। পাশাপাশি শরতের উৎসবও চলে, যেমন ১৬৩৪ সাল থেকে চলে আসা নাগাসাকি কুনচি উৎসব, যেখানে নাচ ও সংগীতে উদযাপিত হয় ফসল তোলার আনন্দ।
দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানি
নামটা ব্ল্যাক ফরেস্ট হলেও, শরতের সময় এই বন যেন রঙে রঙে ভরে ওঠে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গাছেরা পরিধান করে কমলা, হলুদ, সোনালি রঙের পরত। জার্মান ট্যুরিস্ট অফিসের লিভ বোয়িং বলেন, “বিএ-৫০০ হাইওয়ে ধরে গাড়ি চালালে পুরো ব্ল্যাক ফরেস্টের শরতের দৃশ্য চোখে ভাসবে।” যাত্রা শুরু হতে পারে স্পা শহর বাদেন-বাদেন থেকে, যেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আরামের নিখুঁত সমাহার। আর এই ভ্রমণেই খুঁজে পাওয়া যায় জার্মানদের এক অনন্য দর্শন—ওয়ালডাইনসামকেইট, অর্থাৎ ‘বনে একাকীত্বের সৌন্দর্য’।
যদি আরও ধীরগতির যাত্রা চান, তবে মোজেল উপত্যকায় এক গ্লাস রিসলিং হাতে আঙুরলতার রঙ বদল দেখা যায়। এই অঞ্চলের ২,০০০ বছরের মদ তৈরির ঐতিহ্য শরতের দৃশ্যকে দেয় আরও সুরভিত আবেশ।
স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ডস
ইউরোপের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত অথচ সবচেয়ে মনোহর শরতের গন্তব্য হতে পারে স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ডস। অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত পুরো অঞ্চল জ্বলে ওঠে কমলা ও লালের উজ্জ্বল আভায়। গ্রীষ্মে এখানে ভিড় জমে উৎসব আর দীর্ঘ দিনের আলোর জন্য, কিন্তু শরতের crisp দিনগুলোয় প্রকৃতি যেন আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
কাইর্গর্মস ন্যাশনাল পার্কের ট্রেইল ধরে হাঁটা হোক, বা পার্থশায়ারের “বিগ ট্রি কান্ট্রি”-র দুই লাখ একর জঙ্গল পেরোনো—প্রতিটি পথেই লুকিয়ে আছে শান্ত সৌন্দর্য। চাইলে লখ লোমন্ডে নৌভ্রমণেও দেখা মিলবে জল আর পাতার রঙের মায়াবী মিলনে। হাইল্যান্ড ক্লাবের পুরনো দুর্গে কিংবা আধুনিক রোকপুল রিজার্ভে থেকে শরতের রাত কাটানো যেন এক কবিতার অভিজ্ঞতা।
















