যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্যে বড় ধাক্কা লেগেছে। দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ এখন কার্যত নেতৃত্বশূন্য ও বিভক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন এই জোট ছিল ইরানের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা বলয়। কিন্তু সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু, ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের নিহত হওয়া এবং সিরিয়া হয়ে লেবাননে যাওয়ার স্থল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এই কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
তেহরান কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিলেও লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক ও পরিমিত। তারা একদিকে আদর্শিক আনুগত্য দেখাতে চায়, অন্যদিকে নিজ নিজ দেশে টিকে থাকার বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
লেবাননে হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বিবৃতিতে সংগঠনটি হামলার নিন্দা করলেও সরাসরি প্রতিশোধমূলক আক্রমণের ঘোষণা দেয়নি। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের পর স্থলপথে সরবরাহ লাইন ভেঙে পড়ায় হিজবুল্লাহ এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। ফলে তারা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানেই সীমিত থাকতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইয়েমেনে হুথি আন্দোলনও জটিল সমীকরণের মুখে। তাদের নেতা কঠোর অবস্থানের কথা বললেও বক্তব্যে ইরানের শক্তি ও সম্ভাব্য জবাবের ওপর জোর দিয়েছেন। একই সময়ে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকার রাজধানী সানা পুনর্দখলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের পক্ষে বড় আকারের যুদ্ধে জড়ালে হুথিদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ এলাকা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইরাকে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। ইরানঘনিষ্ঠ বহু সশস্ত্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হিসেবেই কাজ করে। তারা যদি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়, তবে তা কেবল মিলিশিয়া নয়, ইরাকি রাষ্ট্রকেও সরাসরি সংঘাতে টেনে নিতে পারে। এতদিন ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের নেতৃত্ব এই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখত, কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ায় সেই নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—সর্বোচ্চ নেতার আদর্শিক কর্তৃত্ব, গার্ড বাহিনীর সমন্বয় এবং সিরিয়া হয়ে ভৌগোলিক সংযোগ। বর্তমানে তিনটিই ভেঙে পড়েছে।
ফলে এখন এই জোট আর একক নির্দেশনায় পরিচালিত সমন্বিত সামরিক শক্তি নয়; বরং আলাদা আলাদা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমষ্টি, যারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তেহরান থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা না এলে প্রত্যেক গোষ্ঠী নিজ নিজ বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে—যা পুরো অঞ্চলকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
খামেনির হত্যাকাণ্ড শুধু একটি নেতৃত্বের অবসান নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকেন্দ্রিক কৌশলগত বলয়ের পুনর্গঠনের সূচনা বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন প্রশ্ন—এই অক্ষ কি পুনরায় সংগঠিত হতে পারবে, নাকি ভাঙনই হবে এর ভবিষ্যৎ?
















