দোহা, দুবাই ও মানামার আকাশরেখায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর উপসাগরীয় দেশগুলো কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়েছে। এতদিন নিজেদের স্থিতিশীল ও নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরা রাষ্ট্রগুলো এখন দ্বিধায়—প্রতিশোধ নেবে, নাকি নীরব থাকবে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে একই কাতারে দেখা যাওয়ার ঝুঁকি এড়াবে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। দুবাইয়ের বিমানবন্দর, মানামার বহুতল ভবন এবং কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র বা তার ধ্বংসাবশেষ।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো এই যুদ্ধ চায়নি। হামলার আগে ওমান মধ্যস্থতার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চালাচ্ছিল। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও শেষ পর্যন্ত হামলা ঠেকানো যায়নি।
এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এক জটিল সমীকরণ। সরাসরি জবাব দিলে তাদের ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধ করছে—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ জনমত ও আঞ্চলিক বৈধতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আবার নীরব থাকলে নিজেদের জনগণ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ উঠতে পারে।
কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সহায়তায় না গিয়ে নিজস্ব কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। উপসাগরীয় যৌথ সামরিক কাঠামো ‘পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের নেতৃত্বে পদক্ষেপ নেওয়ার পথ বেছে নিতে পারে, যাতে তারা অনুসারী নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে উঠে আসে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জ্বালানি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ গ্রিড ও পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র নিয়ে। প্রচণ্ড তাপপ্রবণ এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যাহত হলে তা ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
তবে সামরিক ক্ষতির চেয়েও বড় ঝুঁকি তাদের সুনামের ওপর। বহু বছর ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের স্থিতিশীল বিনিয়োগ ও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আকাশে ধোঁয়া আর ক্ষেপণাস্ত্রের দৃশ্য সেই ভাবমূর্তিকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংকট মধ্যপ্রাচ্যে রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতের নতুন অধ্যায় উন্মোচন করছে। এতদিন প্রক্সি সংঘাত ও সীমিত উত্তেজনা দেখা গেলেও এখন তা পূর্ণমাত্রার সামরিক লড়াইয়ের রূপ নিচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো আপাতত দ্রুত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। তারা চায় সংঘাতের বাইরে থাকতে, কিন্তু তাদের ঝকঝকে নগরীর আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের আগুন সেই সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত করে দিচ্ছে। এখন সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—তারা কি যুদ্ধের অংশ হবে, নাকি কূটনীতির শেষ সুযোগটুকু আঁকড়ে ধরবে।















