যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান পাল্টা আঘাত হেনেছে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—ইরানের হাতে কী ধরনের অস্ত্র আছে, যা দিয়ে তারা এই প্রতিক্রিয়া চালাচ্ছে?
কেন পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিচ্ছে
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার পর তেহরান এটিকে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। তাই সীমিত প্রতিক্রিয়ার বদলে শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক জবাব দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি: মূল ভরসা
ইরানের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু তার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার। মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় বলে মনে করা হয়। এতে রয়েছে স্বল্প, মধ্য ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, পাশাপাশি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র
প্রায় ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিকটবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানার জন্য তৈরি। ফাতেহ, জোলফাগার, কিয়াম-১ ও শাহাব-১/২ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র এই শ্রেণিতে পড়ে। একসঙ্গে একাধিক নিক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত করে তোলাই এদের কৌশল।
মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র
প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লার শাহাব-৩, ইমাদ, ঘাদর, খোররমশাহর ও সেজ্জিলের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ইরানকে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পৌঁছানোর সক্ষমতা দেয়। সেজ্জিল কঠিন জ্বালানিচালিত হওয়ায় দ্রুত প্রস্তুত করা যায়, যা আকস্মিক হামলার ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়।
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিচু দিয়ে উড়ে এবং ভূখণ্ড অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায়, ফলে সেগুলো শনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন। সৌমার, হোভেইযেহ ও পাভেহ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উল্লেখযোগ্য।
ড্রোন ইরানের আরেকটি বড় শক্তি। এগুলো তুলনামূলক সস্তা এবং একসঙ্গে বহু ড্রোন পাঠিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে তোলার কৌশল নেওয়া যায়। দীর্ঘ সময় আকাশে হুমকি তৈরি করে রাখাও সম্ভব হয়।
ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি
ইরান বহু বছর ধরে পাহাড় ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও নিক্ষেপব্যবস্থা তৈরি করেছে। এসব ঘাঁটি দ্রুত ধ্বংস করা কঠিন, ফলে প্রথম দফার হামলার পরও প্রতিশোধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় থাকে।
হরমুজ প্রণালি: অর্থনৈতিক চাপের অস্ত্র
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নৌমাইন, ড্রোন ও দ্রুতগামী নৌযান ব্যবহার করে এই পথকে অস্থির করে তুলতে পারে। পূর্ণ অবরোধ না করেও জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি করে বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলা সম্ভব।
মার্কিন ঘাঁটি: লক্ষ্য ও ঝুঁকি
উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে মার্কিন বাহিনীর বিস্তৃত উপস্থিতি রয়েছে। এতে একদিকে আকাশ প্রতিরক্ষা ও পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বাড়ে, অন্যদিকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। একাধিক স্থানে একযোগে চাপ সৃষ্টি করলে রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাব বদলে যেতে পারে।
ইরানের বার্তা
ইরানি নেতৃত্ব স্পষ্ট করেছে যে তাদের ভূখণ্ডে হামলা মানে সীমিত সংঘর্ষ নয়, বরং বৃহত্তর যুদ্ধের সূচনা। তাই ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সমুদ্রপথে চাপ ও আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীর সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে বহুস্তরীয় প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে তেহরান।
সব মিলিয়ে, ইরানের সামরিক শক্তির মূল ভরকেন্দ্র তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা, যা সরাসরি আঘাতের পাশাপাশি প্রতিরোধ, প্রতিশোধ এবং অর্থনৈতিক চাপ—তিনটিই একসঙ্গে প্রয়োগের সুযোগ দেয়।
















