অতিমাত্রায় টান, অস্থিরতা আর সারাক্ষণ একজনকে নিয়েই ভাবনা—এই অভিজ্ঞতাকে অনেকেই সাধারণ ভালো লাগা বা ক্রাশ মনে করেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন “লিমেরেন্স”। সত্তরের দশকে মনোবিজ্ঞানী ডরোথি টেনভ এই শব্দটি ব্যবহার করেন এমন এক মানসিক অবস্থার বর্ণনায়, যেখানে কারও প্রতি আকর্ষণ এতটাই প্রবল ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে যে তা স্বাভাবিক প্রেমের অনুভূতির সীমা ছাড়িয়ে যায়।
নিউরোসায়েন্টিস্ট টম বেলামি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তিনি সুখী দাম্পত্য জীবনে থাকা সত্ত্বেও এক সহকর্মীর প্রতি গভীর টান অনুভব করতে শুরু করেন। তিনি সেই সম্পর্ক চাননি, এমনকি বিষয়টি সহকর্মীকেও জানাননি। তবু সারাক্ষণ তাকে নিয়েই ভাবতেন। তার ভাষায়, লিমেরেন্স যেন এক ধরনের পরিবর্তিত মানসিক অবস্থা—শুরুর দিকে তা উচ্ছ্বাস, শক্তি ও আশাবাদ বাড়ায়, প্রায় নেশার মতো অনুভূতি দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা অস্থির ও ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে, কারণ মানুষ বুঝতে পারে অনুভূতিগুলোর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই।
গবেষণা বলছে, লিমেরেন্সের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো অনিশ্চয়তা। সাধারণ প্রেমে মানুষ প্রিয়জনের প্রতিদান পেলে স্বস্তি পায় বা প্রত্যাখ্যাত হলে কষ্ট পেয়ে ধীরে ধীরে তা মেনে নেয়। কিন্তু লিমেরেন্সে মানুষ অনিশ্চয়তার সেই পর্যায়েই আটকে থাকে—আশা আর ভয় মিলিয়ে এক ধরনের স্থায়ী মানসিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। বেলামি এই ক্ষীণ আশাকে বলেন “গ্লিমার”—প্রতিদান পাওয়ার সম্ভাবনার ক্ষুদ্র ইঙ্গিতই এই আবেগকে টিকিয়ে রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিমেরেন্স মানুষকে দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। অনেকে খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, ব্যক্তিগত পরিচর্যা বা কাজকর্মে অবহেলা করতে শুরু করেন। তারা অতীতের প্রতিটি কথোপকথন বিশ্লেষণ করেন, ছোট ছোট ইঙ্গিত খুঁজে বেড়ান এবং অন্য সব সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যান। এ কারণেই এটি সাধারণ মোহ বা প্রেমের প্রাথমিক উত্তেজনা থেকে আলাদা। মোহ সাধারণত কয়েক মাস স্থায়ী হয় এবং তাতে ততটা মানসিক বা শারীরিক ক্ষতি দেখা যায় না।
তবে লিমেরেন্সকে এখনো স্বীকৃত মানসিক রোগ হিসেবে ধরা হয় না। এটি কোনো ব্যক্তিত্ব বিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলেও প্রমাণ নেই। কিছু গবেষক সম্ভাব্যভাবে এটিকে উদ্বিগ্ন সংযুক্তি ধারা বা অন্যান্য মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করেন, কিন্তু এ বিষয়ে তথ্য সীমিত। মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লিমেরেন্ট ব্যক্তি নিজের অনুভূতির সীমা বোঝেন এবং তা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন না। যদিও চরম ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর আচরণে রূপ নিতে পারে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই অবস্থা থেকে কি সুস্থ সম্পর্কের দিকে যাওয়া সম্ভব? বেলামির ক্ষেত্রে তা হয়েছে—তিনি নিজের স্ত্রীর কাছে বিষয়টি স্বীকার করেন এবং সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন। তার মতে, যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করা বা স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান পাওয়া লিমেরেন্স কমাতে সাহায্য করতে পারে। কারণ আশা বা অনিশ্চয়তার ক্ষীণ আলো নিভে গেলে এই আবেগ টিকতে পারে না।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, লিমেরেন্স একদিকে মানব মনের গভীর আবেগের প্রকাশ, অন্যদিকে তা নিয়ন্ত্রণহীন হলে কষ্টের কারণ হতে পারে। তাই ভালো লাগা কখন আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে, তা বোঝা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
















