যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে আবারও সম্পর্ক তীব্র উত্তেজনার মধ্যে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখনো বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে আচরণ করতে হবে।
গত ৯ অক্টোবর বেইজিং বিরল ধাতু রপ্তানিতে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং তালিকাভুক্ত উপাদানের সংখ্যা বাড়ায়। এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা চীনের এক “ক্ষমতার প্রদর্শন” বলে অভিহিত করেছেন, যা ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে নেওয়া হয়েছে।
চীন বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক বিরল ধাতু মজুতকারী দেশ এবং এসব ধাতু ইলেকট্রিক যান, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা শিল্প পর্যন্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহৃত হয়।
প্রথমবারের মতো চীন ঘোষণা করেছে, যেসব দেশে এসব খনিজ ব্যবহার করে তৈরি সেমিকন্ডাক্টর বা ম্যাগনেট রপ্তানি হয়, তাদেরও এখন রপ্তানির জন্য বিশেষ লাইসেন্স নিতে হবে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রও চীনের ওপর নতুন চাপ তৈরি করে। ওয়াশিংটন তাদের ‘এনটিটি লিস্ট’-এ আরও কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান যুক্ত করে, যাতে বেইজিংয়ের উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপস পাওয়া সীমিত হয়। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র চীন-সম্পৃক্ত জাহাজের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছে, যা দেশটির জাহাজ নির্মাণ খাতকে সহায়তা ও বৈশ্বিক শিপিং বাণিজ্যে চীনের প্রভাব কমাতে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পাল্টা জবাবে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন বা পরিচালিত জাহাজে শুল্ক আরোপ করেছে।
কানাডার এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশন-এর গবেষণা পরিচালক ভিনা নাজিবুল্লাহ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ শুল্ক আরোপের পদক্ষেপ সরাসরি কোনো বাণিজ্যচুক্তির অংশ নয়, বরং কৌশলগত প্রতিক্রিয়া।” তিনি আরও বলেন, “এখন দুই দেশই তথ্যে যুদ্ধ চালাচ্ছে—এক পক্ষ অন্য পক্ষকে বিশ্বকে জিম্মি করে রাখার অভিযোগ করছে।”
নাজিবুল্লাহর মতে, “চীন এবার এমন এক ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে যা কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, অন্য দেশগুলোকেও প্রভাবিত করবে। এটি আগের তিন মাসের যেকোনো সংঘাতের চেয়ে ভিন্ন ও গুরুতর এক বাণিজ্যযুদ্ধ।”
এটি ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে আসন্ন বৈঠকের আগে চীনের এক ধরনের কৌশলগত চাল, বলেছেন অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো ডেক্সটার টিফ রবার্টস। তার মতে, “চীন এখন মনে করছে আলোচনার ভার তাদের দিকেই, তাই তারা আরও চাপ দিতে চাইছে।”
রবার্টস বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ এখন বিশৃঙ্খল। তারা একদিকে চীনের ওপর একাধিক শুল্ক হুমকি দিচ্ছে, আবার কিছুদিন পরেই সেগুলো শিথিল করছে। এমনকি ট্রাম্প কখনো বলেন বৈঠক হবে না, পরে আবার বলেন বৈঠক হবে।”
তার মতে, “ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পারছে না, চীন প্রচুর চাপ সহ্য করতে প্রস্তুত এবং কেবল হুমকি দিয়ে তাদের নত করা সম্ভব নয়।”
রবার্টস আরও বলেন, “ট্রাম্প এখন চীনের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি করতে চান এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি সফরের পরিকল্পনা করেছেন, কারণ তিনি এটি নিজের ‘বড় চুক্তি-সফলতা’ হিসেবে দেখাতে চান। চীন তা বুঝে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।”
মিডলবেরি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও চীনের অর্থনৈতিক নীতিবিশেষজ্ঞ ওয়েই লিয়াং বলেন, “ট্রাম্প সবসময় শুল্ক আরোপের হুমকি দেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরে আসেন—এ কারণেই তাকে নিয়ে ‘ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেনস আউট’ বা ‘ট্যাকো’ নামক একটি শব্দ তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্প শেয়ারবাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর অন্য যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি নির্ভর করেন। তাই তিনি সহজেই ছাড় দিতে পারেন, যা চীনের মতো প্রতিপক্ষ কাজে লাগাচ্ছে।”
লিয়াং জানান, চীন নিজেও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। দেশটির প্রবৃদ্ধি কমেছে, বেকারত্ব বেড়েছে এবং তথ্যের স্বচ্ছতার অভাবে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে শি জিনপিং এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে জনগণকে বোঝাতে চাইছেন, দেশের সমস্যার মূল কারণ ট্রাম্পের নীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক।
তিনি আরও বলেন, “এখন চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে ‘ডিকাপল’ বা বিচ্ছিন্ন হতে প্রস্তুত, যা অতীতে অকল্পনীয় ছিল।”
চীন এখন রপ্তানিতে বৈচিত্র্য এনেছে, বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য জোরদার করছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন সয়াবিন, বিমান বা চিপ সরঞ্জাম না পেলেও তারা বিকল্প উৎস খুঁজে নিচ্ছে।
নাজিবুল্লাহ বলেন, “চীন অনেক আগেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। অন্য দেশগুলোকেও এখন বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে, কারণ চীনের কৌশল এখন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।”
















