এশিয়াজুড়ে বিলাসবহুল আকাশভ্রমণের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিশ্বের শীর্ষ বিমান নির্মাতারা। ব্যক্তিগত জেট থেকে শুরু করে প্রিমিয়াম বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ—সবখানেই লক্ষ্য এখন অল্পসংখ্যক কিন্তু অত্যন্ত ধনী যাত্রী।
সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ার সবচেয়ে বড় বিমান ও প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী Singapore Airshow-তে এই প্রবণতার স্পষ্ট ছাপ দেখা গেছে। প্রদর্শনীর এক কোণে রাখা ছিল Gulfstream-এর সর্বাধুনিক জি৭০০ জেট। সাধারণ যাত্রীবাহী বা সামরিক বিমানের ভিড় থেকে আলাদা এই জেটের ভেতরে ঢুকতে আগ্রহীদের দীর্ঘ লাইন ছিল—যা ব্যক্তিগত বিমানের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহেরই ইঙ্গিত।
হালকা রঙের চামড়ার আসন, চকচকে কাঠের কাজ, বিশাল জানালা আর আলাদা শয়নকক্ষ ও শাওয়ারসহ কেবিন—এই জেটগুলোকে বলা হচ্ছে আকাশের ‘বাসযোগ্য এলাকা’। দাম কোটি কোটি ডলার হলেও ক্রেতাদের আগ্রহ কমছে না।
বিমান চলাচলবিষয়ক গবেষণা সংস্থা WingX-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত জেট ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ লাখে, যা মহামারির আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে বিশ্বে ৩ কোটি ডলারের বেশি সম্পদশালী অতিধনীদের সংখ্যা পাঁচ বছরে ৭০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
গালফস্ট্রিমের বৈশ্বিক বিক্রয় প্রধান স্কট নিল বলেন, বড় করপোরেশন ও উচ্চসম্পদশালীরা এখন দ্রুত ও সরাসরি যাতায়াতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বাণিজ্যিক বিমানে একাধিক সংযোগে সময় নষ্ট করার চেয়ে ব্যক্তিগত জেটকে তারা বেশি কার্যকর মনে করছেন।
এই বাজারে গালফস্ট্রিম একা নয়। ফ্রান্সের Dassault Aviation, কানাডার বম্বার্ডিয়ার, ব্রাজিলের এমব্রায়ের এবং সেসনা নির্মাতা টেক্সট্রন অ্যাভিয়েশন—সবাই বিলাসবহুল ব্যবসায়িক জেট নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। দাসোঁ তাদের সামরিক বিমানের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবসায়িক জেটে ব্যবহার করে আরাম ও কর্মক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলছে।
বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলো যেখানে খুব কম লাভে চলতে বাধ্য—আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা International Air Transport Association-এর হিসাবে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ—সেখানে ব্যক্তিগত জেট বিক্রি হয় কম সংখ্যায় কিন্তু অত্যন্ত উচ্চ দামে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ থেকেও বড় অঙ্কের আয় হয় নির্মাতাদের।
এশিয়া এই বৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্র। বিমান পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ২০২৫ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বেড়েছে ৮ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, এমনকি ভারত ও থাইল্যান্ডেও ব্যক্তিগত জেটের চাহিদা বাড়ছে। ছোট রানওয়ে থাকা দ্বীপাঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকায় বড় বিমানের তুলনায় ছোট ব্যবসায়িক জেট বেশি কার্যকর হওয়ায় এই প্রবণতা আরও জোরালো হচ্ছে।
চীন, একসময় এশিয়ায় সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত জেট বহরের দেশ হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা ধীরগতির। তবে চীনা কোম্পানিগুলো বিশ্ববাজারে আরও সক্রিয় হলে আবার চাহিদা বাড়বে বলে আশা নির্মাতাদের।
এই বিলাসভিত্তিক প্রবণতা নিয়ে সমালোচনাও আছে। পরিবেশবিদদের মতে, ব্যক্তিগত জেট সবচেয়ে কার্বন-নিঃসরণকারী ভ্রমণ মাধ্যমগুলোর একটি। গালফস্ট্রিম দাবি করছে, তাদের নতুন জেট শতভাগ টেকসই জ্বালানিতে উড়তে পারে, আর দাসোঁ আংশিক মিশ্র জ্বালানি ব্যবহার করছে। তবে পর্যাপ্ত টেকসই জ্বালানির সরবরাহ ও উচ্চমূল্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
বিলাসে ঝোঁক শুধু ব্যক্তিগত জেটেই সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্যিক বিমান সংস্থারাও ধনী যাত্রীদের টানতে প্রিমিয়াম কেবিন বাড়াচ্ছে। তাইওয়ানের Starlux কম ভাড়ার যাত্রী কমিয়ে প্রথম শ্রেণি, বিজনেস ও প্রিমিয়াম ইকোনমি সেবায় জোর দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে ধনীদের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে বিলাসবহুল আকাশভ্রমণের এই ধারা শিগগির থামার কোনো লক্ষণ নেই।
















