চকচকে নিয়োগ ওয়েবসাইট, হাসিখুশি তরুণ কর্মীদের ছবি আর ‘অবিশ্বাস্য গতি’, ‘অসীম কৌতূহল’, ‘গ্রাহকই সব’—এমন স্লোগানে ভরা বিজ্ঞাপন। সঙ্গে আকর্ষণীয় বেতন, বিনা মূল্যে খাবার, জিম সদস্যপদ, স্বাস্থ্য ও দন্তচিকিৎসা সুবিধার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সবকিছুর শেষে রয়েছে একটি সতর্কবার্তা—সপ্তাহে প্রায় ৭০ ঘণ্টা কাজ করতে আগ্রহী না হলে আবেদন না করাই ভালো।
এটি নিউইয়র্কভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রিলার নিয়োগ বিজ্ঞাপন। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এমন সফটওয়্যার বিক্রি করে, যার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কাজ করা বিক্রয়কর্মীদের কার্যক্রম নজরদারি করা যায়। দ্রুতগতির কর্মসংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি এখন আলোচনায়, যা পরিচিত ‘৯৯৬’ সংস্কৃতি নামে—সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ।
বেশিরভাগ মানুষের কাছে বিষয়টি ক্লান্তিকর হলেও রিলার গ্রোথ বিভাগের প্রধান উইল গাও বলেন, তাঁদের ১২০ কর্মী বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন। তাঁর ভাষায়, তারা অলিম্পিক ক্রীড়াবিদের মতো মানুষ খোঁজেন—যাদের আছে প্রবল আকাঙ্ক্ষা, একাগ্রতা ও সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কাজের সময় নির্দিষ্ট নয় বলেও জানান তিনি। কোনো আইডিয়া মাথায় এলে ভোর পর্যন্ত কাজ করে পরদিন দেরিতে অফিসে আসার সুযোগও থাকে।
গত কয়েক বছরে প্রযুক্তি খাতে এই ধরনের কর্মপদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন এত দ্রুতগতিতে হচ্ছে যে, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আগে বাজার দখলের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিপুল বিনিয়োগের এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার ভয় থেকেই কর্মীদের ওপর দীর্ঘ সময় কাজের চাপ বাড়ছে।
৯৯৬ সংস্কৃতির সূচনা হয় এক দশক আগে চীনে। তখন দেশটি সস্তা পণ্যের কারখানা থেকে উন্নত প্রযুক্তির নেতৃত্বে যেতে চাইছিল। আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা একে ‘আশীর্বাদ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর মতে, শিল্পী, বিজ্ঞানী বা রাজনীতিক—সব সফল মানুষই দীর্ঘ সময় কাজ করেন। তবে এই মানসিকতার বিরুদ্ধে শ্রমআইন লঙ্ঘন ও অতিরিক্ত কাজের অভিযোগে সমালোচনা বাড়তে থাকে। ২০২১ সালে সরকার আইনি পদক্ষেপ নেয়। ফলে প্রকাশ্যে এই সংস্কৃতির সমর্থন কমে গেলেও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।
চীনের বাইরে এই সংস্কৃতির সমর্থকও রয়েছে। ভারতের আইটি প্রতিষ্ঠান ইনফোসিসের প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণ মূর্তি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কোনো দেশ এগোয় না। যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে এআই খাতেই এই প্রবণতা বেশি। নিয়োগ বিশেষজ্ঞ অ্যাড্রিয়ান কিনারসলির মতে, বিনিয়োগকারীদের চাপেই স্টার্টআপগুলো মনে করছে, বেশি সময় কাজ মানেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা।
জার্মান উদ্যোক্তা ম্যাগনুস মুলার সহ-প্রতিষ্ঠিত ব্রাউজার-ইউজ নামের এআই স্টার্টআপে কর্মী সংখ্যা কম হলেও কাজের চাপ বেশি। তিনি বলেন, সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ করতে চাইলে এই পরিবেশে টিকে থাকা কঠিন। তাঁর মতে, কাজটি এত প্রতিযোগিতামূলক যে পুরোপুরি ডুবে না গেলে সাফল্য আসে না।
তবে সবাই একমত নন। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মেনলো ভেঞ্চার্সের অংশীদার ডিডি দাস বলেন, দীর্ঘ সময় কাজ মানেই উৎপাদনশীলতা নয়। তাঁর মতে, অভিজ্ঞ কর্মীরা কম সময়েও বেশি ফল দিতে পারেন। অতিরিক্ত কাজ দীর্ঘমেয়াদে কর্মীদের ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বাড়ায়। যদিও তিনি স্বীকার করেন, প্রতিষ্ঠাতাদের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন—নিজেদের বিনিয়োগ ও লাভের আশায় তারা সাধারণত সপ্তাহে ৭০ থেকে ৮০ ঘণ্টা কাজ করেন।
কর্মসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ তামারা মাইলস বলেন, এই ‘হাসল কালচার’ টেকসই নয়। অনেক সময় মানুষ বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করে—চাকরির বাজার খারাপ, ভিসার চাপ বা ক্ষমতার অসমতা এর কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটিও উদ্বেগজনক। জাপানে অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যু বা আত্মহত্যার জন্য আলাদা শব্দ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২১ সালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজের ফলে ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় সাত লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, প্রধানত হৃদরোগ ও স্ট্রোকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের সময় বাড়লে শুরুতে উৎপাদনশীলতা বাড়ে, কিন্তু এক পর্যায়ে তা কমতে শুরু করে। সাধারণভাবে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টাকে সবচেয়ে কার্যকর ধরা হয়। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির কারণে কর্মদক্ষতা কমে যায়।
তারপরও অনেক প্রতিষ্ঠান কম কর্মী রেখে বেশি সময় কাজ করানোর পথে হাঁটে, কারণ নতুন কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের খরচ থাকে। কিন্তু গবেষণা বলছে, সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টা কাজ করা একজন কর্মীর উৎপাদনশীলতা অনেক ক্ষেত্রে ৫০ ঘণ্টা কাজ করা কর্মীর চেয়ে বেশি নয়।
এই ধারণা নতুন নয়। একশ বছর আগে গাড়ি নির্মাতা হেনরি ফোর্ড কর্মঘণ্টা কমিয়ে পাঁচ দিনের ৪০ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ চালু করেছিলেন।
যুক্তরাজ্যে করপোরেট আইন ফার্ম বা বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা নতুন কিছু নয়। জরিপে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে দিনে ১২ ঘণ্টার বেশি কাজ স্বাভাবিক। যদিও আইনে গড়ে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ বাধ্যতামূলক নয়, কর্মীর সম্মতিতে তা বাড়ানো যায়।
মানবসম্পদ নীতিবিদ বেন উইলমট বলেন, দীর্ঘ সময় কাজের সঙ্গে উৎপাদনশীলতার সরাসরি সম্পর্ক নেই। বরং স্মার্টভাবে কাজ করা, ব্যবস্থাপনার উন্নতি ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারেই ফল আসে।
কিছু কর্মী অধিকারকর্মীর মতে, কর্মঘণ্টা কমালে বরং লাভ হতে পারে। ২০২২ সালে চার দিনের কর্মসপ্তাহ নিয়ে এক পরীক্ষায় দেখা যায়, কর্মীদের চাপ ও অসুস্থতা কমেছে, কর্মী ধরে রাখা সহজ হয়েছে, অথচ উৎপাদনশীলতা কমেনি।
তবে নিয়োগ বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ৯৯৬ সংস্কৃতির আগ্রহ মূলত প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ। ব্রাউজার-ইউজের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাগনুস মুলারের মতে, সিলিকন ভ্যালিতে তাঁদের কাজ আসলে খুব কঠিন কিছু নয়। তাঁর গ্রামের কৃষকেরা প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত, সপ্তাহে সাত দিন কাজ করেন—তাদের তুলনায় প্রযুক্তি কর্মীদের জীবন অনেকটাই আরামদায়ক।
















