যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার হেফাজতে থাকা ৩৩ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী লেকা কোরদিয়াকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নিতে হয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে আটক থাকা এই নারী টেক্সাসের একটি আটক কেন্দ্রে খিঁচুনি নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ দমনের যে অভিযান শুরু করেছে, তার অংশ হিসেবেই কোরদিয়াকে আটক করা হয়। বর্তমানে তিনি টেক্সাসে আটক রয়েছেন।
তার আইনজীবীরা বলছেন, ২০২৪ সালে নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণেই তাকে নিশানা করা হয়েছে। তবে ফেডারেল সরকার দাবি করছে, ছাত্র ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুক্রবার হাসপাতালে নেওয়ার পর থেকে কোরদিয়ার সঙ্গে তার পরিবার বা আইনজীবীরা কোনো যোগাযোগ করতে পারেননি। তারা এখনও জানেন না, তাকে কোথায় ভর্তি করা হয়েছে বা তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা কী।
লেকা কোরদিয়া কে
কোরদিয়ার জন্ম ও বেড়ে ওঠা অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ শহরে। ২০১৬ সালে তিনি প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং নিউ জার্সির প্যাটারসনে বসবাসরত তার মায়ের সঙ্গে থাকেন। তার মা একজন মার্কিন নাগরিক।
পরবর্তীতে তিনি পর্যটক ভিসা থেকে ছাত্র ভিসায় রূপান্তর করেন। তার মা নাগরিকের স্বজন হিসেবে তাকে স্থায়ীভাবে থাকার আবেদন করলে ২০২১ সালে তার গ্রিন কার্ড অনুমোদিত হয়। তবে শিক্ষকের ভুল পরামর্শের কারণে তার ছাত্র ভিসার মেয়াদ ২০২২ সালে শেষ হয়ে যায় বলে আইনজীবীদের দাবি।
গ্রেপ্তারের আগে কোরদিয়া নিউ জার্সির একটি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন এবং তার অটিস্টিক সৎভাইয়ের দেখাশোনায় সহায়তা করতেন।
ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধে তার ব্যক্তিগত ক্ষতিও রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে তার পরিবারের ২০০ জনের বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময় তাকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হলেও সেই মামলা পরে বাতিল হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ নিয়মিত অভিবাসন সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দিতে নিউ জার্সির নিউয়ার্কে আইসিই কার্যালয়ে গেলে সেখান থেকেই তাকে আটক করা হয়। কোরদিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে কোনো চিহ্নবিহীন গাড়িতে তুলে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের টেক্সাসে পাঠানো হয়।
তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না কিংবা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নেত্রীও ছিলেন না। তবু কলম্বিয়া বিক্ষোভ থেকে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই একমাত্র, যিনি এখনও মুক্তি পাননি।
অভিযোগ কী
মার্কিন সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে আত্মীয়দের কাছে অর্থ পাঠানোর মাধ্যমে কোরদিয়া সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন—এমন সন্দেহ রয়েছে। তার আইনজীবীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, তার গ্রেপ্তারের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক নেই। তাদের দাবি, ছাত্র ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করায় তাকে আটক করা হয়েছে।
কোরদিয়া নিজেকে কোনো আন্দোলনের নেতা বা কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে চান না। তার ভাষায়, তিনি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম, যিনি সংগীত, মৃৎশিল্প আর পাহাড়ে হাঁটতে ভালোবাসেন। গাজায় যা ঘটছে, তার বিরুদ্ধে কথা বলা তিনি নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেছিলেন।
তার আটক জীবনের অবস্থা
টেক্সাসের আলভারাডোতে আইসিইর আটক কেন্দ্রে থাকার সময় তাকে নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কখনো মেঝেতে গদি পেতে ঘুমাতে হয়েছে, আবার ধর্মীয় খাদ্য বা নামাজের উপযোগী পরিবেশও পাননি।
তার লেখা অনুযায়ী, আটক কেন্দ্রের পরিবেশ নোংরা, ভিড়পূর্ণ ও অমানবিক। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মেঝেতে রাখা প্লাস্টিকের কাঠামোয় ঘুমিয়েছেন, যেখানে তেলাপোকার উপদ্রব ছিল।
তার পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, গ্রেপ্তারের পর তাকে দেখতে গিয়ে কোরদিয়াকে অত্যন্ত দুর্বল ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মনে হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও কিছু মার্কিন রাজনীতিক তাকে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, তার ধর্মীয় অধিকার বারবার লঙ্ঘন করা হয়েছে।
কেন তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়
শুক্রবার সকালে আটক কেন্দ্রের বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান কোরদিয়া। এরপর তার খিঁচুনি ওঠে। সেখান থেকেই তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তার আইনজীবী ও পরিবার সরকার এবং আটক কেন্দ্রের কাছে তার স্বাস্থ্য ও অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত কেউ জানাতে পারেনি তিনি কোথায় আছেন বা কীভাবে তার চিকিৎসা হচ্ছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভ কী ছিল
২০২৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরুদ্ধে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশ ডেকে সেই বিক্ষোভ ভেঙে দেয় এবং বহু শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শিক্ষার্থীরা গাজায় যুদ্ধ বন্ধ এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলো থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের দাবি জানায়।
এই বিক্ষোভের জেরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বহু শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে এবং প্রশাসনের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলও স্থগিত করেছিল।
















