অস্ট্রেলিয়ায় অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে জুলি ইনম্যান গ্রান্টের দায়িত্ব শুরু হওয়ার আগেই তাঁর দপ্তর যে ভয়াবহ হুমকি ও গালাগালির মুখে পড়ে—সেটাই অনেক কিছু বলে দেয় এই কাজ কতটা কঠিন। প্রতি সপ্তাহে হত্যার হুমকি থেকে ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত অসংখ্য বার্তা সামলাতে হয় তাঁর টিমকে, আর এর বড় অংশই ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে লক্ষ্য করে ছোড়া।
অস্ট্রেলিয়ার ইসেফটি কমিশনের প্রধান হিসেবে ইনম্যান গ্রান্ট রয়েছেন ইন্টারনেট যুদ্ধের একেবারে সম্মুখভাগে। ভুয়া তথ্য, সেন্সরশিপ, অনলাইন ট্রলিং আর শিশুদের নিরাপত্তা—সবকিছুই তাঁর কাজের পরিধিতে পড়ে। দীর্ঘদিন প্রযুক্তি খাতে কাজ করার পর এখন তিনি অবস্থান করছেন অন্য প্রান্তে, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হয়।
এই ভূমিকাই তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পরিচিত আমলাদের একজন বানিয়েছে, আবার একই সঙ্গে করেছে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। নব্য নাৎসি গোষ্ঠীর ডক্সিংয়ের শিকার হওয়া, ইলন মাস্কের সঙ্গে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কিছু সদস্যের ক্ষোভ—সবই এসেছে এই দায়িত্বের সঙ্গে।
এর মধ্যেই তাঁকে বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত—১৬ বছরের নিচে সব শিশুকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে রাখা। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কিশোর-কিশোরীদের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কার্যত বাদ দেওয়া।
এই আইন কার্যকর হওয়ার পর ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, ইউটিউবসহ অন্তত ১০টি প্ল্যাটফর্ম এর আওতায় পড়েছে। বহু অভিভাবক এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সন্তানদের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে টানাপোড়েনে সরকারের পাশে থাকা এক ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।
তবে সমালোচনাও কম নয়। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও শিশু কল্যাণকর্মীদের কেউ কেউ বলছেন, নিষেধাজ্ঞার চেয়ে শিক্ষা ও সচেতনতা বেশি জরুরি। অনেকের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হবে এবং এতে গ্রামীণ এলাকার শিশু, প্রতিবন্ধী কিশোর বা এলজিবিটিকিউ পরিচয়ধারী তরুণরা বঞ্চিত হতে পারে, যাদের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অনেক সময় একমাত্র সহায়ক কমিউনিটি।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অবস্থানও দ্বিধামিশ্রিত। তারা আইন মানার কথা বললেও মনে করে, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা সমাধান নয়।
ইনম্যান গ্রান্টের যুক্তি ভিন্ন। তাঁর মতে, শিশুদের অনলাইন দুনিয়ায় প্রবেশ কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে পারলেও সেটি চেষ্টা করার মতো উদ্যোগ। তিনি ডিজিটাল জগতকে সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করেন। যেমন সাঁতার শেখানো ছাড়া কাউকে সমুদ্রে নামতে দেওয়া হয় না, তেমনি শিশুদেরও ঝুঁকি বোঝাতে হবে, শিকারি ও প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে।
মজার বিষয় হলো, একসময় তিনিও নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব ও শর্ত নিয়ে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা পাওয়ার পর তাঁর অবস্থান বদলায়। নিজের বাড়িকেই তিনি মজা করে ‘ল্যাবরেটরি’ বলেন—তিন সন্তানের মধ্যে একজন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নির্বিকার, আর আরেকজন আতঙ্কিত যে ইনস্টাগ্রাম আর স্ন্যাপচ্যাট হারাতে হবে।
ইনম্যান গ্রান্টের নিজের জীবনও প্রযুক্তির আবর্তেই গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে বেড়ে ওঠা, কংগ্রেসে কাজ, এরপর মাইক্রোসফট, টুইটার ও অ্যাডোবিতে দীর্ঘ কর্মজীবন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে বুঝিয়েছে, প্রযুক্তি দুনিয়ায় নিরাপত্তা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
দুই দশকের বেশি সময় ভেতর থেকে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণই হয়তো বেশি কার্যকর। সেই পথেই তিনি অস্ট্রেলিয়ার অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব নেন।
এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে আইনি লড়াইও সামলাতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক চাপ, প্রযুক্তি জায়ান্টদের বিরোধিতা—সবই তাঁর নিত্যদিনের বাস্তবতা।
এর আগেও তিনি বড় বিতর্কের মুখে পড়েছেন। একবার সহিংস ঘটনার ভিডিও সরানোর নির্দেশ দিলে একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। তখন তাঁকে ‘সেন্সরশিপ কমিশার’ আখ্যা দিয়ে ব্যাপক অনলাইন আক্রমণ চালানো হয়। গবেষণায় দেখা যায়, একদিনেই তাঁর বিরুদ্ধে হাজার হাজার আপত্তিকর পোস্ট করা হয়েছিল।
এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। তাঁর মতে, সহিংস কনটেন্ট স্বাভাবিক করে তোলে, মানুষকে সংবেদনশূন্য করে এবং কখনো কখনো উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দেয়। তাই একসময় অবস্থান নিতেই হয়।
সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এখন তাঁর নজর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে। তিনি মনে করেন, এআই নিয়ন্ত্রণে দেরি হলে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
প্রায় এক দশক ধরে এই পদে থাকা ইনম্যান গ্রান্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁর মেয়াদ শেষ হলে দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দিতে পারেন। তবে প্রযুক্তি দুনিয়াকে নিরাপদ করার লক্ষ্যে তাঁর লড়াই এখানেই শেষ হবে না—কোনো না কোনোভাবে তিনি এই ক্ষেত্রেই কাজ চালিয়ে যেতে চান।
তার ভাষায়, এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান ও দায়িত্ব, আর এর জন্য দরকার হয়েছে অসীম দৃঢ়তা ও মানসিক শক্তি।
















