চরম বাস্তুচ্যুতি ও ট্রমার মধ্যেও জন্মভূমিতে টিকে থাকাই তাঁদের প্রতিরোধ
দুই বছর ধরে ইসরায়েলের আরোপিত অবরোধের পর চলতি সপ্তাহে গাজা ও মিসরের মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা অনেক ফিলিস্তিনি কিছুটা স্বস্তি পেলেও, গাজার বহু প্রবীণ মানুষের কাছে এই সুযোগ তেমন অর্থ বহন করে না। তাঁদের কাছে গাজায় থেকে যাওয়াই বেঁচে থাকা, প্রতিরোধ এবং ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকার শামিল।
উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার বাসিন্দা ৭৩ বছর বয়সী কেফায়া আল আসসার বর্তমানে মধ্য গাজার নুসেইরাতে একটি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর মতে, গাজা ছেড়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি তাঁর বাবা-মায়ের একটি ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের চেষ্টা। ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় তাঁর বাবা-মা নিজ গ্রাম জুলিস ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন, যা এখন ইসরায়েলের ভেতরে অবস্থিত।
কেফায়া বলেন, ছোটবেলায় তাঁরা বাবা-মাকে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার জন্য দোষারোপ করতেন। ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে তিনি ইতোমধ্যে পাঁচবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। স্বামীহারা ও নিঃসন্তান কেফায়ার কাছে প্রতিবারের বাস্তুচ্যুতি তাঁর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ট্রমাকে আবার জাগিয়ে তোলে।
তিনি বলেন, ইতিহাস যেন আবারও ফিরে এসেছে। তাঁর বাবা-মা পালাতে গিয়ে সব হারিয়েছিলেন, আর এখন তিনিও ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারিয়ে বাস্তুচ্যুত। শৈশবে শরণার্থী শিবিরের তাঁবুতে থাকার স্মৃতি আজ আবার বাস্তব হয়ে উঠেছে।
নিজের বাড়ি জাবালিয়ায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আপাতত নুসেইরাতেই থাকতে হচ্ছে কেফায়াকে। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এর অর্থ গাজা ছেড়ে চলে যাওয়া নয়। চিকিৎসার জন্য হলেও বাইরে যাওয়ার কথা তিনি ভাবছেন না। উচ্চ রক্তচাপসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগলেও তাঁর সিদ্ধান্ত অটল—নিজের মাটিতেই মৃত্যু চান তিনি।
রাফাহ সীমান্ত খোলার বিষয়টি গাজার তথাকথিত দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতির অংশ হলেও, ইসরায়েল নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েক ডজন রোগীকেই পরিবারসহ গাজা ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হাজারো মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা নিছক এই ধ্বংসস্তূপের জীবন থেকে পালানোর আশায় তালিকায় নাম তুলছেন।
গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ইতোমধ্যে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং অধিকাংশ স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
গাজার আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক তালাল আবু রুকবা বলেন, ইসরায়েল গাজায় বসবাসের অযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি করছে এবং জীবনের প্রয়োজনীয় সবকিছু থেকে ফিলিস্তিনিদের বঞ্চিত করছে। তাঁর মতে, যখন মানুষ প্রতিরোধ করে নিজ ভূমিতে থেকে যায়, তখন তারা ফিলিস্তিনশূন্য ভূমির ধারণাকে ব্যর্থ করে দেয়।
ইসরায়েলের ডানপন্থি রাজনীতিকদের একটি অংশ প্রকাশ্যেই গাজায় অবৈধ বসতি স্থাপন ও ফিলিস্তিনিদের উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে আসছে। এই বাস্তবতায় প্রবীণ ফিলিস্তিনিদের গাজায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবীণদের সংকট অনেকটাই উপেক্ষিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হেল্পএইজ ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবরোধের কারণে গাজায় প্রবীণদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রবীণদের ৭৬ শতাংশ তাঁবুতে বসবাস করছেন। ৮৪ শতাংশের মতে, তাঁদের জীবনযাপন স্বাস্থ্য ও গোপনীয়তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ওষুধের অভাবে ৬৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা বন্ধ বা কমাতে বাধ্য হয়েছেন। প্রায় অর্ধেক মানুষ অন্যদের জন্য খাবার বাঁচাতে নিজের খাবার এড়িয়ে যাচ্ছেন।
মানসিক দিক থেকেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। ৭৭ শতাংশ প্রবীণ জানিয়েছেন, দুঃখ, উদ্বেগ, একাকীত্ব ও অনিদ্রা তাঁদের ক্ষুধা ও সামগ্রিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৮৫ বছর বয়সী নাজমিয়া রাদওয়ানও তাঁদের একজন। ১৯৪৮ সাল থেকে শরণার্থী জীবন কাটানো এই বৃদ্ধা বর্তমানে দেইর আল বালাহতে বাস্তুচ্যুত। অসুস্থ, অপুষ্ট ও ওষুধবিহীন অবস্থায়ও তিনি গাজা ছাড়তে রাজি নন।
নাজমিয়া বলেন, তাঁর পুরো জীবনই কেটেছে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে। ক্লান্ত, অসুস্থ ও নিঃসঙ্গ হয়েও তিনি গাজা ছেড়ে যাওয়ার কথা কল্পনাও করেন না। তাঁর ভাষায়, ভিক্ষুক হয়ে, গৃহহীন হয়েও তিনি গাজাতেই থাকতে চান।
















