প্রায় এক হাজার বছর আগে লেখা ভাইকিং যুগের রুন লিপি আজও সুইডেনে একের পর এক আবিষ্কৃত হচ্ছে। এসব পাথরের লেখায় উঠে আসছে ভালোবাসা, শোক, পারিবারিক স্মৃতি এবং যুদ্ধের কাহিনি—যেন অতীতের মানুষগুলো হঠাৎ করে কথা বলতে শুরু করেছে।
কয়েক বছর আগে সুইডেনের রুন বিশেষজ্ঞ Magnus Källström স্টকহোমের দক্ষিণে একটি খামারে যান একটি অদ্ভুত পাথর দেখতে। কৃষক সেটিকে দরজার পিঁড়ি বানাতে চেয়েছিলেন। উল্টে দিতেই দেখা যায় খোদাই করা ডালপালার মতো চিহ্ন—ভাইকিংদের ব্যবহৃত রুন লিপি। শব্দ ধরে ধরে পড়ার পর প্রকাশ পায় এক হাজার বছর আগের বার্তা—গারদের তার বাবা সিগদিয়ারভের স্মরণে এই পাথর স্থাপন করেছেন।
এ ধরনের আবিষ্কার সুইডেনে অস্বাভাবিক নয়। রাস্তা নির্মাণ, জমি চাষ কিংবা ঘর সংস্কারের সময় হঠাৎ করেই রুন পাথর বেরিয়ে আসে। কোথাও কোথাও এগুলো ভাঙা পাথর হিসেবে বাড়ির ভিত্তি বা গির্জার দরজার নিচে চাপা পড়ে ছিল। এমনকি নরওয়েতে ২০২৩ সালে প্রায় দুই হাজার বছর পুরোনো একটি রুন পাথরও পাওয়া গেছে।
রুন শব্দটির উৎস প্রাচীন নর্স ভাষা থেকে, যার অর্থ গোপন। প্রায় দুই হাজার বছর আগে উত্তর ইউরোপে এই লিপির জন্ম। গবেষকদের মতে, দক্ষিণ ইউরোপে ভ্রমণের সময় লাতিন লিপির সঙ্গে পরিচিত হয়ে উত্তর ইউরোপীয়রা নিজেদের ভাষার জন্য আলাদা লিখনপদ্ধতি তৈরি করেন। কাঠ, হাড়, পাথর এমনকি দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসেও রুন খোদাই করা হতো।
সবচেয়ে টেকসই ও দৃশ্যমান নিদর্শন হলো রুন পাথর। মানুষের সমান বা তার চেয়েও বড় এসব পাথর সাধারণত রাস্তা, সেতু বা জনসমাগমস্থলে স্থাপন করা হতো। ভাইকিং যুগে, অর্থাৎ ৮০০ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে, এগুলোর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। অনেক গবেষকের মতে, রুন পাথর ছিল ভাইকিং যুগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
বেশিরভাগ রুন পাথরই স্মৃতিস্তম্ভ। কোথাও লেখা আছে সন্তানের শোক, কোথাও স্বামীর স্মরণে স্ত্রীর কথা, আবার কোথাও ভাইকিং অভিযানে মৃত্যুর বিবরণ। এক পাথরে লেখা—এক সাহসী যুবক পশ্চিমের পথে ভাইকিং অভিযানে মারা গেছেন। আরেকটিতে এক গৃহিণীর প্রশংসা করা হয়েছে, যিনি পরিবারের সম্পত্তি দক্ষতার সঙ্গে সামলাতেন।
সব লেখাই যে গম্ভীর, তা নয়। হাড়ে খোদাই করা কিছু রুন ছিল ধাঁধা বা রসিকতা। একদিকে পড়লে লেখা আছে, ব্যাখ্যা করো, আর উল্টো করে পড়লে—সুস্বাদু বিয়ার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো ছিল ভাইকিংদের পার্টি কৌতুক।
এই রুন পাথরগুলো ভাইকিংদের জীবন-মৃত্যুর পাশাপাশি তাদের সমাজ, জমির অধিকার এবং বিশ্বাসের কথাও জানায়। কিছু পাথরে সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে, আবার কোথাও বিশ্বাসঘাতকতার গল্প বা পারিবারিক উত্তরাধিকারের ঘোষণা রয়েছে।
সবচেয়ে রহস্যময় পাথরগুলোর একটি হলো Rök rune stone। নবম শতকে তৈরি এই পাথরে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ রুন লেখা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি বীরত্বগাথা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় ধারণা করা হচ্ছে, এতে জলবায়ু পরিবর্তন ও শীতল আবহাওয়ার ভয় নিয়ে ইঙ্গিত থাকতে পারে। গবেষকরা বলছেন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পরের শীতল সময়ে ফসল ও জীবন নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার প্রতিফলন থাকতে পারে এই লেখায়।
উপসালা ও গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, প্রতিটি যুগ তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যা করে। একসময় জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা প্রাধান্য পেয়েছিল, এখন জলবায়ু উদ্বেগের আলোকে নতুন পাঠ সামনে আসছে।
আজ রুন পাথরগুলো ধূসর ও ক্ষয়প্রাপ্ত। কিন্তু একসময় এগুলো ছিল উজ্জ্বল রঙে রাঙানো, যাতে দূর থেকেই চোখে পড়ে। সুইডেনের গ্রামাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব পাথর আজও অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে রাখছে।
তবে আধুনিক সময়ে রুনের ব্যবহার সবসময় নিরীহ নয়। নাৎসি ও উগ্র ডানপন্থীরা একসময় রুন ও নর্স প্রতীককে নিজেদের মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত করায় এর একটি অন্ধকার দিকও তৈরি হয়েছে।
তবুও, ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার বছরের পুরোনো পাথরগুলো দেখলে মনে হয়, ভাইকিং যুগের মানুষগুলো এখনও কিছু বলতে চায়—ভালোবাসা, শোক, গর্ব আর জীবনের গল্প।
















