২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া সুদানের গৃহযুদ্ধে ড্রোন ক্রমেই প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী—উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সুদানের সশস্ত্র বাহিনী ও র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যকার এই সংঘাত দেখিয়েছে, কীভাবে সহজে লুকানো যায় এমন বাণিজ্যিক ড্রোন আধুনিক যুদ্ধে ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। এসব ড্রোন বহু বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করেছে এবং অনেক শহরকে বিদ্যুৎ ও গরমের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে।
এই সংঘাতে ড্রোন যুদ্ধের ইতিহাস, ব্যবহৃত ড্রোনের ধরন, সরবরাহের পথ, হামলার এলাকা ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জাঞ্জাওয়িদ থেকে আরএসএফ: যুদ্ধের বিবর্তন
আরএসএফের উৎপত্তি দারফুর সংঘাতের সময়কার সরকার–সমর্থিত মিলিশিয়া জাঞ্জাওয়িদ থেকে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে বিদ্রোহ দমনে তাদের ব্যবহার করা হয়। জাতিসংঘ জাঞ্জাওয়িদের বিরুদ্ধে গ্রাম পোড়ানো, গণহত্যা ও যৌন সহিংসতার মতো যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলে।
২০১৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল–বশির জাঞ্জাওয়িদদের আনুষ্ঠানিকভাবে আরএসএফে রূপ দেন। নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদ হামদান দাগালো, যিনি হেমেতি নামে পরিচিত। ২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে অংশ নেওয়ার সময় আরএসএফ হাজার হাজার যোদ্ধা পাঠায়, যার মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে হেমেতির সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
শুরুতে হালকা অস্ত্র ও গাড়িনির্ভর বাহিনী হলেও সময়ের সঙ্গে আরএসএফ ভারী কামান এবং শেষ পর্যন্ত ড্রোন ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়। ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল–বুরহান ও হেমেতির মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়।
ড্রোনের আগমনে আকাশে সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে যায়।
কারা কী ধরনের ড্রোন ব্যবহার করছে
সুদানের সমতল ভূপ্রকৃতি ড্রোন হামলার জন্য উপযোগী। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উভয় পক্ষই স্বল্প পাল্লার ড্রোন থেকে শুরু করে চার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লার ড্রোন ব্যবহার করেছে।
সেনাবাহিনীর ড্রোন
সেনাবাহিনী মূলত নজরদারি ও নির্ভুল হামলার জন্য ড্রোন ব্যবহার করছে। এসব ড্রোনের বড় অংশ এসেছে ইরান থেকে। মোহাজের–৬ নামের যুদ্ধ ড্রোন সর্বোচ্চ দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে উড়তে পারে এবং নির্ভুল বোমা বহনে সক্ষম।
আরএসএফের ড্রোন
নিজেদের বিমান বাহিনী না থাকলেও আরএসএফ চীন ও সার্বিয়ায় তৈরি বিভিন্ন ড্রোন ব্যবহার করছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে। কামিকাজে ড্রোন থেকে শুরু করে ভারী বোমাবাহী ড্রোনও তাদের হাতে রয়েছে, যেগুলো লেজার–নির্দেশিত বোমা ফেলতে পারে।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক কোয়াডকপ্টার ড্রোনে মর্টারের গোলা বসিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ড্রোন আঘাতে বিস্ফোরিত হয়, যা অত্যন্ত নির্বিচার ও প্রাণঘাতী।
ড্রোন সরবরাহ আসে কোথা থেকে
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে ড্রোন ও যন্ত্রাংশ পাচার করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী মিসর, ইরান, তুরস্ক ও রাশিয়ার কাছ থেকে সহায়তা পাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অন্যদিকে আরএসএফের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। চাদ, দক্ষিণ সুদান, লিবিয়া ও সোমালিয়া হয়ে অস্ত্র ও ড্রোন আরএসএফের হাতে পৌঁছাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ আমিরাত অস্বীকার করেছে।
ড্রোন হামলা কোথায় হয়েছে
সংঘাত শুরুর পর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত এক হাজার তিনটি ড্রোন হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে রাজধানী খার্তুমে। এছাড়া উত্তর ও পশ্চিম করদোফান, উত্তর ও দক্ষিণ দারফুরেও ব্যাপক হামলা হয়েছে।
একাধিক হামলায় বেসামরিক স্থাপনা, বিমানঘাঁটি, গুদাম ও আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতি
ড্রোন হামলায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে উত্তর দারফুর, পশ্চিম করদোফান ও উত্তর করদোফানে। শুধু খার্তুমেই চার শতাধিক মানুষ ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে দক্ষিণ করদোফানের একটি কিন্ডারগার্টেন ও হাসপাতালে একাধিক ড্রোন হামলায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য।
সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আরএসএফের ড্রোন হামলায় সাত শতাধিক এবং সেনাবাহিনীর ড্রোন হামলায় এক হাজার আট শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
ভবিষ্যৎ সংঘাতের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, সুদানের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে মিলিশিয়া বাহিনী ড্রোনের মাধ্যমে বড় শক্তির মোকাবিলা করতে পারবে। ড্রোন যুদ্ধকে আরও অনিশ্চিত, বিধ্বংসী ও বেসামরিক মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
সুদান প্রমাণ করছে, বিমান বাহিনী ছাড়াও কীভাবে একটি মিলিশিয়া আকাশ থেকে আঘাত হানতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ভবিষ্যতের অনেক সংঘাতেই এমন চিত্র আরও বেশি দেখা যেতে পারে।
















