মায়ের ফোন নম্বর ব্লক করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও তাকে মুছে ফেলেছিলেন জর্ডান লাক্স। তখন তার বয়স ছিল ২৫। ক্ষোভ ও গভীর আঘাতে তিনি দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, মায়ের সঙ্গে আর কখনো কথা বলবেন না। সেই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় তিন বছর ধরে মা ড্যানি অ্যাকারম্যানের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ও সংবেদনশীল এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা আবার একে অপরের জীবনে ফিরতে পেরেছেন। মা ও মেয়ে দুজনেই এখন তাদের ভাঙা সম্পর্ক, বিচ্ছেদ এবং পুনর্মিলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন, যা পারিবারিক দূরত্ব ও সমাধানের একটি বিরল দুই দিকের চিত্র দেখায়।
বর্তমানে ৩৩ বছর বয়সী জর্ডান ক্যালিফোর্নিয়া থেকে বলেন, ছয় বছর ধরে ধীরে ধীরে শেখা, ঝগড়া, রাগে ফোন কেটে দেওয়া এবং ঠিকভাবে যোগাযোগ করতে না পারার মধ্য দিয়েই তাদের এই পথচলা। অন্যদিকে ৫৯ বছর বয়সী ড্যানি লাস ভেগাসে বসে স্বীকার করেন, মেয়ের জীবনে তিনি অনেক সময় উপস্থিত থাকতে পারেননি এবং বড় ভুল করেছেন। থেরাপি ও অসংখ্য কষ্টকর কথোপকথনের মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে পারিবারিক জটিলতা বুঝতে ও মেরামত করতে শুরু করেন।
সম্প্রতি এক বিখ্যাত পরিবারের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। এ নিয়ে মতামতও বিভক্ত। কেউ এটিকে অকৃতজ্ঞতা বলছেন, আবার কেউ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
ড্যানি ও জর্ডান দুজনেই জোর দিয়ে বলেন, পারিবারিক বিচ্ছেদ কখনো কখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে। তারা কারও ওপর জোর করে পুনর্মিলনের পরামর্শ দিচ্ছেন না।
গবেষণায় দেখা যায়, পারিবারিক বিচ্ছেদ ধারণার চেয়ে বেশি সাধারণ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় চারজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন অন্তত একজন পরিবারের সদস্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকে এবং পুনর্মিলন সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নতুন প্রজন্ম মানসিক আঘাত ও সীমারেখা সম্পর্কে বেশি সচেতন। তাই তারা নিজেদের মানসিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না। এই পরিবর্তন অনেক অভিভাবকের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জর্ডানের ক্ষেত্রে শৈশবের অভিজ্ঞতাই মূল ভূমিকা রেখেছে। বাবা-মায়ের তিক্ত বিচ্ছেদ ও পরবর্তী অস্থির বছরগুলো তার মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি অনুভব করতেন, তার মা কেবল ভালো সময়ে পাশে থাকতেন, খারাপ দিকগুলো এড়িয়ে যেতেন।
২০১৭ সালে ড্যানির ব্যক্তিগত জীবনের এক সংকটের সময় সহানুভূতি প্রত্যাশা করায় জর্ডান সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। ড্যানির জন্য এটি ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তিনি বুঝতেই পারেননি, কেন মেয়ে তার সঙ্গে কথা বলছে না।
এ ধরনের বিচ্ছেদকে বিশেষজ্ঞরা জীবিত মানুষের সঙ্গে এক ধরনের অনিশ্চিত শোক বলে বর্ণনা করেন। বিশেষ করে মায়েদের জন্য এটি সামাজিকভাবে কলঙ্কজনক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
প্রায় তিন বছর পর হঠাৎ করেই জর্ডান মাকে ফোন করেন। নিজের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া ও থেরাপির অভিজ্ঞতা তাকে মায়ের কথা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সেই ফোন কল থেকেই তাদের পুনরায় যোগাযোগ শুরু হয়। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক বছর সময় লেগেছে।
ড্যানি বলেন, তিনি সব সময় সতর্ক থাকতেন, যেন কোনো ভুল করে আবার মেয়েকে হারাতে না হয়। এখন তারা নিজেদের গল্প প্রকাশ্যে ভাগ করে নিচ্ছেন, যেখানে অনেক অভিভাবক নিজেদের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন খুঁজে পাচ্ছেন।
গবেষণায় দেখা যায়, যেসব ক্ষেত্রে পুনর্মিলন সম্ভব হয়েছে, সেখানে অভিভাবকেরা ক্ষমা চাওয়ার জোর না দিয়ে ভবিষ্যতের সম্পর্ক গড়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন এবং নিজেদের ভূমিকা নিয়ে সৎ আত্মসমালোচনা করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছিন্ন সন্তানের কাছে খোলা মন ও দোষারোপহীন ভাষায় লেখা চিঠি বা বার্তা পুনর্মিলনের প্রথম ধাপ হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মিলন সম্ভব নাও হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে সীমিত যোগাযোগই বাস্তবসম্মত সমাধান।
ড্যানি ও জর্ডানের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল—আত্মরক্ষামূলক মনোভাব পরিহার, সময় লাগবে তা মেনে নেওয়া এবং সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ।
এখন জর্ডান বিবাহিত, নিজেও একজন মা। নতুন বাড়িতে উঠছেন, আর সেই সময় তাকে সাহায্য করতে ড্যানি উড়ে যাচ্ছেন। জর্ডান বলেন, এক সময় এমন চাপের মুহূর্তে মাকে পাশে কল্পনাও করতে পারতেন না। এখন তিনি কৃতজ্ঞ, কারণ মা পাশে থাকছেন।
















