পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোতে সামরিক সরকারের এক ডিক্রির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং তাদের সম্পদ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত দেশটির গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
বৃহস্পতিবার জারি করা ডিক্রিতে ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরের নেতৃত্বাধীন সরকার রাজনৈতিক দল গঠন ও পরিচালনাসংক্রান্ত সব আইন বাতিল করে দেয়। সরকারের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলগুলো নির্ধারিত বিধিবিধান মানতে ব্যর্থ হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বুরকিনা ফাসো ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়েদা-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতার মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার একাধিক দেশের মতো বুরকিনা ফাসোতেও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ক্ষমতা দখল করেন ইব্রাহিম ত্রাওরে। তার আট মাস আগেই আরেকটি অভ্যুত্থানে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রোশ মার্ক কাবোরে ক্ষমতাচ্যুত হন।
মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধী রাজনীতিকরা ত্রাওরের শাসনব্যবস্থাকে কর্তৃত্ববাদী বলে সমালোচনা করলেও, ৩৭ বছর বয়সী এই সেনানায়ক অনলাইনে প্যান-আফ্রিকানপন্থীদের মধ্যে বড় ধরনের জনপ্রিয়তা গড়ে তুলেছেন। অনেকেই তাকে প্রয়াত বিপ্লবী নেতা থমাস সাঁকারার সঙ্গে তুলনা করছেন।
ত্রাওরের উপনিবেশবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তব্য আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি ভিডিওর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, যা তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও পরিচিত করেছে।
তবে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক বলে মনে করেন দাকারভিত্তিক বিশ্লেষক বেভারলি ওচিয়েং। তার মতে, বিচার বিভাগকে সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আনার সাম্প্রতিক সাংবিধানিক পরিবর্তনের পর সামরিক সরকারের প্রভাব আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, সামনে দেশে ক্ষমতার বিভাজন বা নাগরিক ও রাজনৈতিক পরিসরে স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ খুবই সীমিত থাকবে এবং সামরিক সরকার তাদের ক্ষমতায় থাকার সময় আরও বাড়াতে পারে।
সরকার কেন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করল
সরকারের দাবি, বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের গঠনতন্ত্র ও বিধি মানেনি। মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমিল জেরবো জানান, বহুদলীয় ব্যবস্থায় নানা অপব্যবহার ও অচলাবস্থার কারণে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত রাজনৈতিক দল সমাজে বিভাজন বাড়িয়েছে এবং সামাজিক সংহতি দুর্বল করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে দলগুলোর নির্দিষ্ট কী ধরনের অনিয়ম ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
অতীতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা
২০২২ সালের অভ্যুত্থানের আগে বুরকিনা ফাসোতে শতাধিক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল। ২০২০ সালের নির্বাচনের পর সংসদে ১৫টি দল প্রতিনিধিত্ব করত। সবচেয়ে বড় দল ছিল পিপলস মুভমেন্ট ফর প্রোগ্রেস, যার ছিল ১২৭ আসনের মধ্যে ৫৬টি।
তবে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা বাড়তে থাকায় সে সময়ের বেসামরিক সরকার তীব্র জনবিক্ষোভের মুখে পড়ে।
ক্ষমতায় এসে ত্রাওরে সশস্ত্র সহিংসতা দমনের প্রতিশ্রুতি দেন এবং আঞ্চলিক জোট ইকোওয়াসকে জানান, ২০২৪ সালের মধ্যে নির্বাচন হবে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং পরে নির্বাচন ২০২৯ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়।
এর পাশাপাশি বুরকিনা ফাসো মালিতে ও নাইজারের সঙ্গে একযোগে ইকোওয়াস ত্যাগ করে সাহেল রাষ্ট্রগুলোর নতুন জোট গঠন করে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকেও সরে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনও বিলুপ্ত করা হয়।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি কি আরও খারাপ হয়েছে
বর্তমানে বুরকিনা ফাসোর প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে। সবচেয়ে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে আল-কায়েদা-ঘনিষ্ঠ জামাআত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন এবং ইসলামিক স্টেট সাহেল শাখা।
ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেশটি রাশিয়ার সহায়তায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে। তবে সহিংসতা কমেনি। বরং ত্রাওরের ক্ষমতায় আসার পর তিন বছরে নিহতের সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে প্রায় ১৮ হাজারে পৌঁছেছে, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক মানুষ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো যেমন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে, তেমনি সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্র মিলিশিয়ার বিরুদ্ধেও বেসামরিক হত্যার অভিযোগ করেছে।
নাগরিক পরিসর কি সংকুচিত হচ্ছে
ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার ভিন্নমত দমন এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগের মুখে পড়েছে। অভ্যুত্থানের পরপরই সব রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
২০২৪ সালে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও মানবাধিকার সংগঠনের ওয়েবসাইট বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের সমালোচকদের অনেককে জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে পাঠানো হয়েছে।
কয়েকজন বিচারক ও সাংবাদিক গ্রেপ্তার বা গুমের শিকার হয়েছেন। যদিও কিছু সাংবাদিক পরে মুক্তি পেয়েছেন, তবে এখনও বেশ কয়েকজন বিরোধী রাজনীতিক ও সমালোচকের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ বুরকিনা ফাসোতে নাগরিক পরিসরকে ক্রমেই সংকুচিত করছে এবং সামরিক শাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
















