যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রয়াত অর্থলগ্নিকারী ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনকে ঘিরে বিপুল পরিমাণ নতুন তদন্ত নথি প্রকাশ করেছে। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির উপ-মহাপরিদর্শক টড ব্লাঞ্চ জানান, তিন মিলিয়নের বেশি পৃষ্ঠার নথির পাশাপাশি দুই হাজারের বেশি ভিডিও এবং প্রায় এক লাখ আশি হাজার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই প্রকাশের মাধ্যমে কংগ্রেসের প্রণীত এপস্টেইন ফাইল স্বচ্ছতা আইনের আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ করা হয়েছে। ব্লাঞ্চের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ ও বিস্তৃত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করেই এসব নথি প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে জনগণের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় এবং আইনের শর্ত মানা হয়।
তবে নথি প্রকাশের গতি এবং প্রকাশিত দলিলগুলোর অনেক অংশ কালো করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সমালোচনার মুখে পড়েছে। এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের অতীত সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে, কারণ এপস্টেইন বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।
শুক্রবার ব্লাঞ্চ স্পষ্ট করে বলেন, ক্ষমতাবান কাউকে রক্ষা করার জন্য বিচার বিভাগ তথ্য গোপন করছে—এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি জানান, ট্রাম্প এপস্টেইনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়ের কথা স্বীকার করলেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচার চক্র সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিচার বিভাগ জানায়, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে সব নথি প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও তারা সেই সময়সীমা পূরণ করতে পারেনি। পরে কংগ্রেসের দ্বিদলীয় সমর্থনে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী সব ফেডারেল নথি প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
আইনটির প্রতিক্রিয়ায় বিচার বিভাগ জানায়, যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের পরিচয় সুরক্ষিত রাখতে শত শত আইনজীবী নথিগুলো পর্যালোচনা করেছেন। চলমান তদন্ত বা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে—এমন উপাদানগুলো প্রকাশ থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
ব্লাঞ্চ জানান, গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ছাড়া এপস্টেইন ফাইলে থাকা সব নারীর পরিচয় ভিডিও ও ছবিতে আড়াল করা হয়েছে। ম্যাক্সওয়েল এপস্টেইনের সাবেক সঙ্গী এবং শিশু যৌন পাচারের দায়ে দণ্ডিত।
এর আগে এপস্টেইনের কয়েকজন ভুক্তভোগী নথির অতিরিক্ত সম্পাদনা ও তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁদের মতে, আগে প্রকাশিত কিছু নথিও নতুন করে কালো করে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার ডেমোক্র্যাট দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তোলেন, কোন যুক্তিতে বাকি নথিগুলো প্রকাশ করা হয়নি।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা রো খন্না বলেন, বিচার বিভাগ ছয় মিলিয়নের বেশি নথি শনাক্ত করলেও সাড়ে তিন মিলিয়নের মতো নথি প্রকাশ করেছে। বাকিগুলো কেন গোপন রাখা হচ্ছে, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমারও দাবি করেন, ট্রাম্প-সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট জবাব দিতে হবে।
গত ডিসেম্বরে বিচার বিভাগ প্রথম দফায় এপস্টেইন সংক্রান্ত কিছু নথি প্রকাশ করেছিল। সেই প্রকাশনায় নব্বইয়ের দশকে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে ট্রাম্পের ভ্রমণের তথ্য উঠে আসে। আগের নথিগুলোতে বিল গেটস, স্টিভ ব্যানন, উডি অ্যালেন ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মতো পরিচিত ব্যক্তিদের এপস্টেইনের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের ছবিও ছিল।
নতুন প্রকাশিত নথি থেকে আরও তথ্য সামনে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ইলন মাস্কের সঙ্গে এপস্টেইনের দ্বীপে সম্ভাব্য সফর নিয়ে ইমেইল, এপস্টেইনের মৃত্যুর আগে স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে বার্তা বিনিময় এবং কারাবন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু সংক্রান্ত তদন্ত নথি।
এ পর্যন্ত ম্যাক্সওয়েল ছাড়া নথিতে উল্লেখিত বা চিত্রিত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি। ম্যাক্সওয়েল দুই হাজার একুশ সালে দণ্ডিত হওয়ার পর বিশ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন, যদিও তিনি এখনো নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
উল্লেখ্য, এপস্টেইন দুই হাজার উনিশ সালের আগস্টে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানানো হয়। তার এক মাস আগে ফেডারেল যৌন পাচারের অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এর আগে দুই হাজার আট সালে ফ্লোরিডায় অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের যৌন অপরাধের মামলায় দোষ স্বীকার করে তিনি তুলনামূলকভাবে হালকা সাজা পান এবং মোট তেরো মাস কারাভোগ করেন।
এপস্টেইনের এক ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া রবার্টস জিউফ্রে অভিযোগ করেছিলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাকে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় দুই হাজার পঁচিশ সালের এপ্রিল মাসে মারা যান। তার অভিযোগে নাম আসা সব পুরুষই তা অস্বীকার করেছেন।
এই তালিকায় যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রু নামেও অভিযোগ ছিল। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও একটি দেওয়ানি মামলা অজ্ঞাত অর্থের বিনিময়ে নিষ্পত্তি করেন। পরে বিতর্কের জেরে যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লস তার রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহার করেন।
















