গুগলের ডিপমাইন্ড তৈরি করা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল ডিএনএ সম্পর্কে মানুষের বোঝাপড়া আমূল বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। মানবদেহ গঠন ও পরিচালনার সম্পূর্ণ নির্দেশনা বহনকারী ডিএনএ কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে এবং ওষুধ আবিষ্কারে কী ভূমিকা রাখে, সে বিষয়ে নতুন দিগন্ত খুলতে পারে এই প্রযুক্তি।
এই মডেলটির নাম আলফাজিনোম। গবেষকদের মতে, ডিএনএর সূক্ষ্ম পার্থক্য কেন উচ্চ রক্তচাপ, স্মৃতিভ্রংশ বা স্থূলতার মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, তা বুঝতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করবে এটি। একই সঙ্গে জিনগত রোগ ও ক্যানসার নিয়ে গবেষণার গতি বহুগুণে বাড়তে পারে।
মডেলটির নির্মাতারা স্বীকার করেছেন, এটি এখনো নিখুঁত নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা একে অসাধারণ সাফল্য এবং জিনোম গবেষণায় একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
ডিপমাইন্ডের গবেষণা প্রকৌশলী নাতাশা লাতিশেভা বলেন, জিনোমের কার্যকর অংশগুলো কী করে কাজ করে, তা বোঝার একটি হাতিয়ার হিসেবে আলফাজিনোমকে দেখা হচ্ছে। এতে জীবনের কোড সম্পর্কে মৌলিক ধারণা আরও দ্রুত এগোবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মানব জিনোম প্রায় ৩০০ কোটি ডিএনএ অক্ষর নিয়ে গঠিত, যা এ, সি, জি ও টি এই চারটি অক্ষরে প্রকাশ করা হয়। এর মাত্র প্রায় দুই শতাংশ অংশ জিন, যা দেহের প্রয়োজনীয় সব প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয়। বাকি ৯৮ শতাংশ অংশ তুলনামূলকভাবে অজানা, যাকে বিজ্ঞানীরা ডার্ক জিনোম নামে অভিহিত করেন। এই অংশই মূলত জিন কখন, কোথায় এবং কীভাবে কাজ করবে তা নিয়ন্ত্রণ করে এবং এখানেই বহু রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন দেখা যায়।
আলফাজিনোম একসঙ্গে ১০ লাখ ডিএনএ অক্ষর বিশ্লেষণ করতে পারে। এর মাধ্যমে ডার্ক জিনোমের জটিলতা উন্মোচনে সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। মডেলটি শুধু জিনের অবস্থান শনাক্তই করে না, বরং ডার্ক জিনোম কীভাবে জিনের কার্যকলাপ প্রভাবিত করছে, যেমন জিন কতটা সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হচ্ছে কিংবা একটি জিন থেকে কীভাবে বিভিন্ন প্রোটিন তৈরি হচ্ছে, সেসবও অনুমান করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জিনগত কোডের একটি অক্ষর বদলালেই তার প্রভাব কী হতে পারে, তা আগাম জানাতে সক্ষম এই মডেল।
লাতিশেভা জানান, কোন পরিবর্তনগুলো রোগ সৃষ্টি করে, তা নির্ধারণে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা তাঁকে ভীষণ আশাবাদী করেছে। বিরল জিনগত রোগের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতেও এটি সহায়ক হতে পারে। ওষুধের লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করা এবং নতুন ওষুধ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এটি গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যোগ করবে বলে তিনি মনে করেন।
দীর্ঘমেয়াদে কৃত্রিম জৈবপ্রযুক্তি ও জিন থেরাপির জন্য নতুন ডিএনএ ক্রম নকশা করতেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
আলফাজিনোম নিয়ে গবেষণার ফলাফল একটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও বাণিজ্যিক ব্যবহারের বাইরে এটি গত বছরই উন্মুক্ত করা হয় এবং ইতিমধ্যে তিন হাজারের বেশি বিজ্ঞানী এই টুল ব্যবহার করেছেন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গ্যারেথ হকস এই মডেল ব্যবহার করে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত জিনগত পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, বৃহৎ জিনোম গবেষণায় যে পরিবর্তনগুলো শনাক্ত হয়, সেগুলোর অনেকই ডার্ক জিনোমে থাকে এবং সেগুলো কীভাবে দেহের জৈবপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে, তা আগে পরিষ্কার ছিল না।
আলফাজিনোম ব্যবহার করে খুব দ্রুত এসব পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব অনুমান করা যায় এবং পরে তা পরীক্ষাগারে যাচাই করা সম্ভব হয়। হকস বলেন, ডার্ক জিনোমের সব রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি, তবে এটি বড় ধরনের অগ্রগতি এবং গবেষণার জন্য অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।
ক্যানসার গবেষণাতেও এই মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোন জিনগত পরিবর্তন ক্যানসারকে এগিয়ে নিচ্ছে এবং কোনগুলো ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা আলাদা করতে আলফাজিনোম ইতিমধ্যেই ব্যবহার করা হয়েছে।
জিনোম গবেষণায় যুক্ত আরেক বিশেষজ্ঞ বলেন, শুধু ডিএনএ ক্রম দেখে জিনের কার্যকলাপ অনুমান করতে পারা এই প্রযুক্তিকে একটি বড় প্রযুক্তিগত সাফল্য হিসেবে ধরা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তাঁরা সতর্ক করে বলেন, এটি এখনো পরিপূর্ণ নয় এবং উন্নয়নের অনেক জায়গা বাকি।
ডিপমাইন্ড দল এর আগেও প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন অনুমান করতে সক্ষম একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আলফাজিনোমকে জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
ডিপমাইন্ডের বিজ্ঞানবিষয়ক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে বহু বৈজ্ঞানিক সাফল্যের পথ খুলে দেবে এবং আমরা এখন সেই যাত্রার একেবারে শুরুতে আছি।
তবে গবেষকেরা স্বীকার করেছেন, মডেলটি দূরবর্তী জিন নিয়ন্ত্রণ বা ভিন্ন ভিন্ন কোষে জিনের আচরণ অনুমান করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম নিখুঁত। একই ডিএনএ থাকা সত্ত্বেও মস্তিষ্কের কোষ ও হৃদযন্ত্রের কোষের আচরণ ভিন্ন হয়। এসব পার্থক্য আরও ভালোভাবে ধরতে ভবিষ্যতে মডেলটির উন্নয়ন করা হবে।
















