মাদ্রিদ, স্পেন—ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দেশে যখন অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে, তখন স্পেন উল্টো পথে হাঁটছে। দেশটি প্রায় পাঁচ লাখ অনিবন্ধিত অভিবাসীকে বৈধ মর্যাদা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে, যা ইউরোপজুড়ে চলমান কঠোর অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্টভাবে ভিন্ন।
খামারে দুর্ঘটনায় বাঁ হাত হারানোর পর প্যাকেট সরবরাহের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ত্রিশ বছর বয়সী পেরুর নাগরিক জোয়েল কাসেদা। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হওয়া স্পেনে আসা বহু অভিবাসীর বাস্তবতা।
এমন পরিস্থিতিতে স্পেন সরকারের নতুন ঘোষণাকে নিজের এবং অন্যদের জন্য আশার আলো হিসেবে দেখছেন কাসেদা। তিনি বলেন, বছরের পর বছর কাগজপত্র ছাড়া কাজ করার পর বৈধ হওয়ার সুযোগ পাওয়া মানে নতুন জীবন শুরু করার সম্ভাবনা। এতে সঙ্গী ও তার মেয়েকে নিয়ে একটি বাসা ভাড়া করে ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ তৈরি হবে।
স্পেনে হাজার হাজার অভিবাসী তথাকথিত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কাজ করেন, যেখানে আইনি স্বীকৃতি পেতে বছরের পর বছর জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। নতুন এই সিদ্ধান্তে তাদের সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে।
স্পেনের অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী এলমা সাইস এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই কর্মসূচির আওতায় আসা ব্যক্তিরা দেশের যেকোনো খাতে এবং যেকোনো অঞ্চলে কাজ করতে পারবেন। তিনি অভিবাসনের ইতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরে বলেন, সরকার ইতোমধ্যে দেশে থাকা মানুষদের স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিতে চায়।
সরকারি হিসাবে, এই সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ লাখের কাছাকাছি হতে পারে। সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আগেই বলেছেন, কর্মী সংকট মোকাবিলা এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ সামাল দিতে স্পেনের অভিবাসন প্রয়োজন।
অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধি লেতিসিয়া ফান দার ভেনেত বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীবিরোধী পরিবেশের বিপরীতে স্পেনের এই পদক্ষেপ মানবিক ও বাস্তবসম্মত। তার মতে, এটি কেবল অভিবাসীদের নয়, পুরো সমাজের জন্যই উপকারী।
ঘানা থেকে স্পেনে আসা ওসমান উমার ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে বছরের পর বছর বিপজ্জনক পথ পেরিয়েছেন। সাহারায় মানবপাচারকারীদের হাতে পরিত্যক্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। স্পেনে পৌঁছানোর পর একসময় রাস্তায় থাকতে হয়েছে, পরে একটি পরিবার তাকে আশ্রয় দেয়। বর্তমানে তিনি একটি সংগঠন পরিচালনা করছেন, যা আফ্রিকার শিশুদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করে।
উমার বলেন, অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়া মানে তারা আইনি পথে কাজ করতে পারবে, কর ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অবদান রাখবে। কম জন্মহারের দেশে এটি পেনশন ব্যবস্থার জন্যও সহায়ক হবে।
সেনেগাল থেকে আঠারো বছর আগে আসা লামিন সার বর্তমানে একটি ফ্যাশন উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করছেন, যা রাস্তার বিক্রেতা অভিবাসীদের শ্রমকে তুলে ধরে। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত অভিবাসীদের অবৈধ শোষণ থেকে বের করে এনে সমাজে সক্রিয় অবদান রাখার সুযোগ দেবে।
এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে তাদের ক্ষেত্রে, যারা অন্তত পাঁচ মাস ধরে স্পেনে বসবাস করছেন এবং ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছিলেন। আবেদনকারীদের সঙ্গে তাদের সন্তানরাও এর আওতায় আসবে। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হবে।
সরকারি ডিক্রির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে, যা সংসদের অনুমোদন ছাড়াই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যদিও বিরোধী রক্ষণশীল ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলো এর কড়া সমালোচনা করেছে।
এক কট্টর ডানপন্থী নেতা অভিযোগ করেছেন, এত বিপুল অভিবাসী বৈধতা পেলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর চাপ পড়বে।
তবে সরকারি তথ্য বলছে, গত বছর স্পেনে অনিয়মিত অভিবাসন চল্লিশ শতাংশের বেশি কমেছে, যার পেছনে মরক্কো ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা ও নিরাপত্তা চুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে।
















